টাইপিস্ট থেকে কোম্পানি সচিব! তিন বছরে তিন পদোন্নতি!!

অডিট বিভাগের প্রধান থাকাকালে যত অনিয়ম!

অনলাইন ডেস্কঅনলাইন ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:৪১ পিএম, ১৯ জুন ২০২১
হায়দার আলী ফকির

রাষ্ট্রীয় অংশীদারী ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (এসএওসিএল )। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয় বিপিসি। তারপরও অনিয়মে জড়িতদের অনেকে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদের মধ্যে অন্যতম প্রতিষ্ঠানটির কোম্পানি সচিব হায়দার আলী ফকির। তিনি ক্লার্ক কাম টাইপিস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দিয়েছিলেন। অভিযোগ আছে ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে চলা যাবতীয় দূর্নীতি অনিয়মের পেছনে তিনি অন্যতম।

 

ওই সময়ে তিন বছরে তিনবার পদোন্নতি পেয়েছেন। এর আগে স্ত্রী ও নিকটাত্মীয়ের নামে নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ডিলারশিপ। জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি দুদক হটলাইনে আসা এক অভিযোগের সূত্র ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রায় ৭ টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখায় অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মঈন উদ্দিন আহমেদ ও তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদের বিরুদ্ধে ৫৭ কোটি টাকা অবৈধভাবে স্থানান্তরের প্রমাণ পায় দুদক।

 

ওই ঘটনার পর ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি এসএওসিএলের ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের আয়ব্যয় ও অডিটসহ সার্বিক আর্থিক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার জন্য চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিপিসি। বিপিসির তদন্ত কমিটি ওই বছরের ২৫ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেয়। আর্থিক অনিয়মের ব্যাপকতা ও এসএওসিএল কর্তৃপক্ষের পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়ায় ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরের নমুনাভিত্তিক কিছু আর্থিক কার্যক্রমের অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়েছে।

 

এসওসিএলের সরবরাহকৃত ব্যাংক বিবরণীর ভিত্তিতে হিসাব পর্যালোচনা করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকসমূহ থেকে সমস্ত ব্যাংক বিবরণীর সঠিকতা যাচাই সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওই তদন্তে প্রায় তিনশ কোটি টাকার অনিয়মের সত্যতা পায় কমিটি। এরপর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠায় বিপিসি।

 

গত বছরের ১৮ আগস্ট করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক | (জিএম) মো: শাহেদ। বিপিসির তদন্ত প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা পায় দুদক। এরপর তারা চলতি বছরের ৯ মার্চ প্রায় ৮১ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মঈন উদ্দীন আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা করে। তবে মারা যাওয়ায় মহাব্যবস্থাপক শাহেদকে মামলায় আসামি করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠানটিতে আত্মসাত সরকারি সম্পদ ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিচ্ছে বিপিসি।

 

জানা যায়, বিপিসির আওতাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও ৫০:৫০ অনুপাতের অংশীদার হওয়ার সুযোগে কাজে লাগিয়ে অংশীদারী প্রতিষ্ঠান এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (এওসিএল) প্রতিনিধি এসএওসিএলের পরিচালক | এবং ম্যানেজমেন্ট অ্যাডভাইজরি কমিটির (ম্যাক) চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগে অনিয়ম দুর্নীতি চলে।

 

বিপিসি এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগ সাজশে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মঈন উদ্দীন আহমদ এবং মহাব্যবস্থাপক মো: শাহেদ বেপরোয়া হন। নিজেদের অনিয়ম ঢাকতে প্রভাবশালীদের সুপারিশে নিয়ম বহির্ভূতভাবে একের পর এক লোক নিয়োগ দেন তারা। নিজেদের অনিয়মের অন্যতম সাক্ষী হায়দার আলী ফকিরকে একের পর এক প্রমোশন দিয়েছেন। হায়দার আলী ফকিরকে নিয়োগ দেওয়া থেকে পদোন্নতি সবগুলোই দিয়েছেন ম্যাক চেয়ারম্যান মঈন উদ্দীন আহমদ।

 

সূত্রে জানা যায়, বিপিসির নিয়োগ পদোন্নতি বিধিমালা অনুযায়ী কর্মকর্তারা তিন বছরে একবার পদোন্নতি প্রাপ্য হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরে তিনবার পদোন্নতি পেয়েছেন হায়দার আলী ফকির। বিপিসির তদন্ত কমিটি ও দুদকের অনুসন্ধানে ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ধরা পড়ে। এই সময়ে হায়দার আলী ফকির প্রতিষ্ঠানটির অডিট বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, হায়দার আলী ফকির অডিট বিভাগে থাকার সুযােগে ম্যাক চেয়ারম্যান ও জিএমের যাবতীয় অনিয়মের সহযোগী ছিলেন। অডিট বিভাগের প্রধান হিসেবে বিভিন্ন ভুয়া বিল তার। হাত দিয়ে নিরীক্ষিত হয়েছে। বছরে বছরে পদোন্নতি, প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ডিলার। ছাড়াও নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন হায়দার আলী ফকির। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালের ৩ আগস্ট ক্লার্ক কাম টাইপিস্ট হিসেবে ১০৯০ টাকা মূল বেতনে যোগ দেন হায়দার আলী ফকির।

 

২০০০ সালের পর থেকে তিনি বেশ কয়েকটি পদোন্নতি পেয়ে কর্মচারী থেকে কর্মকর্তা হন। ২০১৩ সালের ১ জুলাই কর্মকর্তা (হিসাব) পদে এম-৭ গ্রেডে পদোন্নতি পান। পরের বছর ১ জুন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা (হিসাব) পদে এম-৬ গ্রেডে পদোন্নতি পান। ২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর সহকারী ব্যবস্থাপক (অডিট) পদে এম-৫ গ্রেডে পদোন্নতি পান।

 

এর আগে ২০১২ সালের ১ জুলাই একটি অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্টও পান। ২০১৩ সাল থেকে তিনি নিরীক্ষা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পাশাপাশি ২০২১ সালের শুরু থেকে কয়েক মাস তিনি প্রতিষ্ঠানটির পর্ষদের কোম্পানি সচিবের দায়িত্বও পালন করেন। শুধু পদোন্নতি নয়, হায়দার আলী ফকির নিজের স্ত্রী ও আত্মীয়ের নামে কোম্পানির (এসএওসিএল) ডিলারশিপও নিয়েছেন। তার স্ত্রী রেবেকা সুলতানার নামে রেবেকা এন্টারপ্রাইজ এবং এক নিকটাত্মীয়ের নামে পদ্মা ট্রেডার্স  ডিলারশিপ রয়েছে।

 

চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি এই দুই ডিলার প্রতিষ্ঠানের নামে ২৫ বোতল করে এলপিজি সিলিন্ডার উত্তোলন করা হয়। এজন্য ১২ কেজির প্রতি সিলিন্ডার ৫৭৫ টাকা করে ১৪ হাজার ৩৭৫ টাকা করে দুই চালানে টাকাও জমা দেওয়া হয়। এসএওসিএলের বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, প্রায় ২০ বছর ধরে নিজ প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি এই ডিলারশিপ ব্যবসা করে আসছেন।

 

হায়দার আলী ফকিরের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জে। তিনি চট্টগ্রামের হালিশহর হাউজিং এস্টেটে প্রান্তিক নামে একটি দ্বিতল বাড়ি কিনেছেন। তবে তিনি থাকেন হালিশহর থানার পেছনে একটি ফ্ল্যাটে। হালিশহর বি ব্লকের ১ নং রোডের | ওই অ্যাপার্টমেন্টে ১৩৫০ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। অ্যাপার্টমেন্টের তিনতলার এক ফ্লোরের দুটি ফ্ল্যাটের একটি স্ত্রীর নামে, অন্যটি তার শ্যালকের নামে। আটতলা। ভবনটির মালিক বেশারত আলী নামে এক ব্যক্তি।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক নেতাকে নিজের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে হায়দার আলী ফকির আজাদীকে বলেন, ডিলারশিপগুলো ইতোমধ্যে বাতিল হয়েছে। তিন বছরে তিনবার পদোন্নতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো ম্যানেজমেন্ট বলতে পারবে। আপনি (প্রতিবেদক) মোরশেদ (বিপিসির ডিজিএম) সাহেবের সাথে আলাপ করেন। আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। নিজের নামে বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্টের বিষয়ে বলেন, প্রান্তিক নামের বাড়িটি ২০১৫ সালে কিনেছি। গ্রামের বাড়ির সম্পদ বিক্রয় করে এই বাড়িটি কেনা। নতুন দুই ফ্ল্যাটের বিষয়ে তিনি বলেন, একটি আমার সম্বন্ধীর নামে। তিনি আমেরিকায় থাকেন। আমি যেটায় থাকি সেটি আমার স্ত্রীর। আমার স্ত্রী বাবার পক্ষ থেকে ফ্ল্যাটটি পেয়েছেন।

 

এ বিষয়ে এসএওসিএলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিপিসির উপ-মহাব্যবস্থাপক মোরশেদ হোসাইন আজাদ বলেন, হায়দার আলী ফকিরের বিষয়টি জানার পর আমি রেবেকা এন্টারপ্রাইজ ও পদ্মা ট্রেডার্সের বরাদ্দ বাতিল করেছি। তবে তার যোগ্যতা রয়েছে। ২০১২ সাল থেকে তিনি কোনো অনিয়মে জড়িত ছিলেন কিনা আমি জানি না। তবে এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন :