১১ জনের হাতে ধর্ষিত পূর্ণিমা আজ সাংসদ

জিএস নিউজ ডেস্কজিএস নিউজ ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১২:০৩ পিএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সৌমেন ভৌমিক:>>>
পূর্ণিমার মা পাথর কন্ঠে মিনতি করছেন, “বাবারা, একসাথে না, একজন একজন কইরা যাও ওর কাছে। হুমায়ুন আজাদের লেখা বই “পাক সার জমিন সাদবাদ” এই ঘটনার উল্লেখ আছে অনেকটা। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় যাওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন নেমে আসে, সেবার ভোটের পরপরই ৮ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার দেলয়া গ্রামের অনিল কুমার শীলের পরিবারের বাড়িতে হামলা হয়। হামলাকারীরা দলবেঁধে ধর্ষণ করে অনিল শীলের ছোট মেয়ে পূর্ণিমাকে, তখন তিনি দশম শ্রেণিতে পড়তেন। ধর্ষণের শিকার হয়ে প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন পূর্ণিমা।

 

ধর্ষণকারীরা সবাই বিএনপি-জামায়াত জোটের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। ২০১১ সালের ৪ মে এই ধর্ষণ মামলায় ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করে আদালত। পূর্ণিমাকে পূর্ণিমার বাড়ির উঠানে ফেলেন ধর্ষণ করেছে ওরা। পূর্ণিমার মাকে খুটিতে বেধেঁ রেখেছে, তার কিশোরী কন্যার বিস্ফোরিত চোখ যন্ত্রনায় কাতর।পূর্ণিমার মা পাথর কন্ঠে মিনতি করছেন, “বাবারা, একসাথে না, একজন একজন কইরা যাও ওর কাছে।

 

হুমায়ুন আজাদের লেখা বই “পাক সার জমিন সাদবাদ ” এই ঘটনার উল্লেখ আছে অনেকটা। পূর্ণিমার কাঁন্না ছাপিয়ে পূর্ণিমার মা’র, গ্রামের কুলবধূটির তুমুল কান্নায় দুপুর দ্বিখন্ডিত, তিনি ভিক্ষে চাইছেন মুসলমান বাবাদের কাছে, “যা করার আমারে করো, ওরে ছাইড়া দেও।” মুমিনুল মুসলমানরা পূর্ণিমাকে ছেড়ে দেয়নি, মুসলমানের দল জিহাদী জোশে পূর্ণিমার মাকেও ছেড়ে দেয়নি।

 

ধর্ষণের শিকার হলেও পড়াশোনা ছাড়েননি পূর্ণিমা। জানালেন, ঢাকায় বিভিন্ন মানুষের বাসায় থাকতে গেলে এক-দুই দিনের বেশি কেউ জায়গা দিতে রাজি হতেন না। ভয় পেতেন। এসব সংগ্রামের মধ্য দিয়েই নবম শ্রেণির পর পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং করেন। ২০০৫ সালে বাবা প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান। চার বোনের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়েছে। পাঁচ ভাই পারিবারিক পেশায় আছেন।

 

২০০১ সালের পর পরিবারটির ওপর নেমে আসে নানা দুর্ভোগ। ঘটনার ১৪ দিন পর ১৭ জনকে আসামি করে মামলা করেছিলেন বাবা। মামলার রায়ে ১১ জনের যাবজ্জীবন এবং ১ লাখ টাকা করে জরিমানা হয়েছে। আসামিদের অনেকেই এখন জামিনে আছেন।পূর্ণিমা বললেন, ‘আমার ঘটনার পর আমার দাদাদের বিয়েতে অনেক ঝামেলা হয়েছে। এমন পরিবারে মেয়ে দিতে চাইতেন না অনেকে। তবে সাহারা খাতুন, ইফতেখারুজ্জামান, শাহরিয়ার কবীর, মরহুম বেবী মওদুদসহ অনেকেই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং এখনো পাশে আছেন।

 

২০০৩ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু ট্রাস্ট থেকে পড়াশোনার জন্য ২ হাজার করে টাকা পেয়েছি। অন্যরাও আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন। ’পূর্ণিমা মনে করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। তিনি তো এ জন্য দোষী না। এখন নিজের পরিচয় দিতে লজ্জা পান না। তবে আক্ষেপ, ধর্ষণের ঘটনার ১৫ বছর পরও তাঁর নাম ও ফোন নম্বর দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে খোলা হয়েছিলো পর্নোগ্রাফি–সংবলিত পেজ। এতে করে তাঁকে নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়। বর্তমানে বাধ্য হয়েই তিনি অন্য নামে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন।

বর্তমানে এই নারী আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায়বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত ১৮ ডিসেম্বর থেকে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে সারা দেশে ৬১টি সমাবেশে অংশ নেন।একাদশ সংসদে সংরক্ষিত আসনের সদস্য হতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ।সংসদে ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায় পূর্ণিমা। ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরুর দিনে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে গিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন তিনি।

 

জানিনা হাসিনার আমলে বাংলাদেশের হিন্দ ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেয়েরা কতটা সুরক্ষিত আছে প্রায় নানান মধ্যম থেকে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের খবর আছে। আসা করি পূর্ণিমা জয়ী সব এবং প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের সাংসদ কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেয়ে নির্যাতিত হলে প্রতিবাদ করবে যাতে তাঁরা সুবিচার পায়।

আপনার মতামত লিখুন :