একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে বেকায়দায় আওয়ামী লীগ,বিএনপি-জামায়াত স্নায়ুযুদ্ধ
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে বেকায়দায় আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ ক্ষেত্রে একক সম্ভাব্য প্রার্থী বিএনপিতে। যদিও জোটগত প্রার্থিতা প্রশ্নে জামায়াত-বিএনপি স্নায়ুযুদ্ধ আছে। দলীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, জোটগত একক প্রার্থী মনোনয়নে দল দুটিতে সংকট সৃষ্টি হলে সে ক্ষেত্রে গত দুবারের মতো এবারও দুদলের প্রার্থীর জন্য প্রতীক উন্মুক্ত থাকতে পারে। আর আইনি জটিলতার কারণে জামায়াত দলীয় প্রতীক না পেলে স্বতন্ত্রভাবে ভোট করার প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে। এ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের যৌথ ভোট আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক বেশি। তাই বিএনপি ও জামায়াত জোটবদ্ধ হয়ে একক প্রার্থী দিলে আওয়ামী লীগের জন্য এ আসন ধরে রাখা খুব চ্যালেঞ্জ হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন জেলার অন্য তিনটি সংসদীয় আসনের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে বিএনপি-জামায়াত এ আসনটি নিজেদের দখলে রাখলেও ৩৮ বছর পর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পায় আওয়ামী লীগ। এর পর ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে এলাকায় সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে দলটি।
তবে একাধিক নাশকতা মামলার আসামি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের যোগদান এবং বর্তমান এমপি আবদুল ওদুদ তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা আছেন কোণঠাসা। এ নিয়ে দলে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ ছাড়া জেলা সম্মেলনে মঈনুদ্দীন ম-লকে সভাপতি ও আবদুল ওদুদকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠনের কিছু দিন পর থেকে বিভিন্ন বিষয়ে দুজনের মতানৈক্য দেখা দেয়। এটি আরও বেগবান হয়েছে এমপি ওদুদের ইশারায় দলে নাশকতা মামলার আসামি জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের যোগদানের কারণে। দুই নেতার দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়েছে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোয়। তারই ধারাবাহিকতায় জেলা ছাত্রলীগ দুটি গ্রুপে বিভক্ত। এর জেরে গত ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রলীগের জেলা সম্মেলন সফল করার মিছিলে কর্মীদের ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে।
এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন বর্তমান এমপি জেলা সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওদুদ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলের সিনিয়র সহসভাপতি মো. রুহুল আমীন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সামিউল হক লিটন, সাবেক ছাত্রনেতা মাহফুজুর রহমান বেঞ্জু, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতা ডা. গোলাম রাব্বানী ফটিক। এমপি আবদুল ওদুদ জানান, স্বাধীনতার ৩৮ বছর পর তিনিই বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করে এ আসনটিতে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেন। তার মতে, এ আসনে আওয়ামী লীগবিরোধী মনোভাব কাটিয়ে ওঠে মানুষ এখন আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকা- এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণতায় আন্তর্জাতিক পরিম-লে দেশের সুনাম বৃদ্ধি পাওয়ায় নৌকার পক্ষে জনসম্পৃত্ততা দিন দিন বাড়ছে। এ কারণেই মানুষ আগামী নির্বাচনে নৌকাকে বেছে নেবে। নাশকতা মামলার আসামিদের যোগদানে দলে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না বলেও মনে করেন তিনি। রুহুল আমীন জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের আমলে দুবার সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। তার মতে, স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুবাদে তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়নে ভূমিকা রাখায় মানুষের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। এ কারণে সবদিক বিবেচনা করে আওয়ামী লীগ তাকে মনোনয়ন দেবে আশা করেন তিনি। চাঁপাইনবাবঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সামিউল হক লিটন। তিনি মনে করেন, পৌরসভা নির্বাচনে মানুষ তাকে চেয়েছিল, কিন্তু ভোটারদের আকাক্সক্ষা পূরণ না হওয়ায় এবার সংসদ নির্বাচনে তাকে প্রার্থী হিসেবে চাচ্ছে।
তিনি মনে করেন, সরেজমিন জনপ্রিয়তা যাচাই করে তাকে দল মনোনয়ন দেবে। ক্লিন ইমেজের নেতা ডা. গোলাম রাব্বানী ফটিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভালো কাজগুলোর কথা গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে গণসংযোগ করছেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে সেতুবন্ধন এবং অন্যদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে কাজ করছেন তিনি। তিনি মনে করেন, এসব বিবেচনায় দল তাকে মনোনয়ন দেবে। সাবেক ছাত্রনেতা মাহফুজুর রহমান বেঞ্জু বলেন, দল ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করলে তিনি মনোনয়নের ব্যাপারে জোর আশাবাদী।
বিএনপি : অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম টিপুকে সভাপতি, আমিনুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক ও শামীম কবির হেলিমকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে সম্প্রতি জেলা কমিটিকে কেন্দ্রীয় বিএনপি অনুমোদন দেয়। এর পর থেকে নেতাকর্মীরা দুটি গ্রুপে বিভক্ত। এক গ্রুপে আছেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হারুন অর রশিদ ও কেন্দ্রীয় নেত্রী পাপিয়ার অনুসারীরা। নতুন কমিটিতে স্থান না পাওয়ায় হারুন-পাপিয়া অনুসারী ৬৮ জন সম্প্রতি দল থেকে পদত্যাগ করেন। বর্তমান জেলা কমিটি অযোগ্য উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবিও জানান তারা। সম্প্রতি নতুন অনুমোদনপ্রাপ্ত জেলা কমিটি হারুন-পাপিয়া অনুসারী মেয়াদোত্তীর্ণ সদর উপজেলা ও পৌর কমিটি ভেঙে দেন। এতে দলের বিভক্তি আরও প্রকট আকার ধারণ করে।
একপর্যায়ে হারুন-পাপিয়া গ্রুপ সদর উপজেলা ও পৌর বিএনপির সম্মেলন আয়োজন করে। সেখানে উপেক্ষা করা হয় জেলা সভাপতি রফিকুল ইসলাম টিপু ও সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামকে। সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এ কারণে সম্মেলনের দিন টিপু-আমিনুল গ্রুপের নেতাকর্মীরা শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এর জেরে শহরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই সম্মেলনে জেলা কমিটিকে পাশ কাটিয়ে কমিটি গঠন করায় রুহুল কবির রিজভীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে টিপু-আমিনুল গ্রুপ। এ ছাড়া গত পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির জেলা সভাপতি রফিকুল ইসলাম টিপুকে মনোনয়ন দেওয়া এবং পরে তা প্রত্যাহার করে জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত আতাউর রহমানকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়েও কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে এখন পর্যন্ত এগিয়ে আছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. হারুনুর রশিদ। তিনি রাজপথের একজন লড়াকু রাজনৈতিক নেতা। বিএনপির শাসনামলে তিনবার এমপি ছিলেন। এলাকার সুষম উয়ন্ননে তার অবদান রয়েছে।
এসব কারণে দল আগামী নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেবে আশাবাদী তিনি। বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল ওয়াহেদের নামও শোনা যাচ্ছে।
জামায়াত : এ আসনে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী ঢাকা দক্ষিণ মহানগর কমিটির আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি বর্তমানে জেলহাজতে আছেন। বুলবুল প্রার্থী হতে না পারলে সাবেক সাংসদ লতিফুর রহমান প্রার্থী হতে পারেন। বুলবুলের মুক্তির দাবি জানিয়ে গোটা জেলায় অসংখ্য পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। দলের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ না পেলেও গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। জেলা সদরে জামায়াতের উত্থান ঘটে ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে। দুটি নির্বাচনেই বিজয়ী হয় জামায়াত। কিন্তু পরে আর আসনটি নিজেদের আয়ত্তে রাখতে পারেনি দলটি। তবে বর্তমানে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও নবাবগঞ্জ পৌরসভার মেয়রের পদটি জামায়াতের দখলেই আছে। সেদিক থেকে বরাবরই সদর আসনে জামায়াতের নিজস্ব ভোটব্যাংকসহ সাংগঠনিক অবস্থা খুবই শক্তিশালী।
জাতীয় পার্টি: এরশাদ সরকারের শাসনামলে আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমীন জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন। পরে তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তখন এ সংসদীয় এলাকায় জাতীয় পার্টির বেশ দাপট ছিল। কিন্তু রুহুল আমীন আবার আওয়ামী লীগে ফিরে গেলে দলটির সাংগঠনিক অবস্থানে ধস নামে। এবার এ আসনে জেলা জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম সোনা মনোনয়ন চাইবেন। তিনি বেশ কয়েকবার গুরুত্বপূর্ণ মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। কিন্তু নজরুল ইসলাম হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় এ আসন থেকে জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাজাহান আলী মনোনয়ন চাইতে পারেন।
জাসদ : জেলা জাসদের (ইনু) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এ আসনে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী হারুন অর রশিদ ৮৫ হাজার ৪৮৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের লতিফুর রহমান ৬০ হাজার ৪৬০ ভোট এবং আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট শামসুল হক ৫৭ হাজার ২৮৯ ভোট পান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আবদুল ওদুদ ১ লাখ ১২ হাজার ৮০২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির হারুন অর রশিদ পান ৮৬ হাজার ১৭৮ ভোট এবং জামায়াতের লতিফুর রহমান পান ৭২ হাজার ২৯২ ভোট। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আবদুল ওদুদ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।



