বাবা আমার বুক ভরা আশা আর অফুরন্ত ভালোবাসা
যে মানুষটির কারণে পৃথিবীর রং-রূপ,মাটির গন্ধ-আলোর স্পর্শ সন্তান পেয়ে থাকে সে মানুষটি “বাবা” ছাড়া আর কেই বা হতে পারেন! আর এজন্যই একজন সন্তানের কাছে বাবা হলেন চির আস্থার প্রতীক, নিরাপত্তার প্রতীক। হঠাৎ তুমুল মানসিক ঝড়, কালবৈশাখীর মতোই আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে খড়কুটোর মতো। সে সময়টায় বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি যা দরকার সেটা হল-মনোবল। আর তারপরেই দরকার ‘অবলম্বন’। একজন বাবা একজন সন্তান তথা একটা গোটা পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ দুটি কাজই করে থাকেন। সন্তানদের জন্য বটবৃক্ষের মতো শক্ত অবলম্বন হিসেবে থাকেন জীবনভর এই মানুষটি।পাশাপাশি সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য আজন্ম খেটে মরেন নির্লিপ্তভাবে। মানুষের জীবন যদি সত্যিকার অর্থেই এক একটি জীবন্ত নাটক হয়ে থাকে তবে নাটকটি সার্থক ভাবে নির্মাণ-নিরুপণের মতো গুরুদায়িত্বটি আজন্ম বয়ে বেড়ান ‘বাবা’ নামের মানুষটি। আর এইজন্যই কবিতা, গল্প, গানসহ শিল্প-সাহিত্য, সংগীতকলার সকল শাখায় বাবা স্থান করে নিয়েছেন এক দায়িত্বশীল স্নেহময় পুরুষের হিসেবে।
……..কাটে না সময় যখন আর কিছুতে/বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না/জানলার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা/মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না/ আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়……..
গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের গাওয়া এই গানটি সন্তানদের মনোচ্ছবিতে প্রতিমুহূর্তে স্নেহশীল,আস্থাভাজন এক প্রতিমূর্তির নিত্য-নিরন্তন-শ্বাশত চরিত্রই দাঁড় করায়।
খুব ছোটবেলা থেকেই দেখতাম আমার বাবা খুব সাধারণ জীবন-যাপনেই অভ্যস্ত। অন্যসব উৎসব-পার্বণের কথা বাদ দিলেও ইদের সময়টার কথা এই বয়সেও স্মৃতির অ্যালবামে দাগ কাটে। প্রতিবারই তিনি আমাদের সবার জন্য পছন্দসই কাপড়-চোপড় কিনে নিয়ে আসতেন শুধু নিজেরটা বাদে। কেন নিজের জন্য কিছু কিনলেন না এই বাকবিতণ্ডা বরাবরি চলত আমার মা আর বাবা’র মধ্যে। পক্ষান্তরে একজোড়া নির্লিপ্ত চোখ নিয়েই তিনি বলতেন,আমার তো আছেই!
আমরা ভাই’রা প্রায়শই অভিমান নিয়েই বলি,”এমন মানুষও কি হয় যুদ্ধ করে সার্টিফিকেট না নিয়ে থাকে!” বাবা তখনো আমাদের অনুপ্রেরণা দিতে নির্লিপ্ততার স্বরেই বলেন,নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য কোটার প্রয়োজন পড়ে না! আমরা চুপসে যাই,ভাবি এই হলেন আমাদের বাবা! সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত,নির্ভেজাল-নির্মোহ আর সরলতার মাঝে নিজেকে লুকিয়ে রাখা অনবদ্য এক প্রতিমূর্তি!
বাবাকে নিয়ে এমন অনেক অজানা গল্পই হয়ত প্রত্যেক সন্তানের বুক পকেটে জমা আছে।বাবার জন্য তুলে রাখা একটি বিশেষ দিনে হয়ত গল্প গুলো জীবন্ত হয়ে উঠবে স্মৃতিকাতরতায় কিংবা ছেয়ে যাবে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর টাইমলাইনে। ‘বাবা’ শব্দটা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় কত ভাবে যে উচ্চারিত হয় তার কোন ইয়ত্তা নেই বৈকি!
জার্মান ভাষায় বাবা শব্দটি হচ্ছে “ফ্যাট্যা” আর ড্যানিশ ভাষায় “ফার”। আফ্রিকান ভাষায় ‘ভাদের’ হচ্ছেন বাবা! চীনে ভাষায় চীনারা আবার ‘বাবা’ কেটে ‘বা’ বানিয়ে নিয়েছে! ক্রী (কানাডিয়ান) ভাষায় বাবা হচ্ছেন ‘পাপা’ তেমনি ক্রোয়েশিয়ান এ ‘ওটেক’ ! ব্রাজিলিয়ান পর্তুগিজ ভাষায় বাবা ডাক হচ্ছে ‘পাই’।
ডাচ ভাষায় পাপা, ভাডের আর পাপাই এই তিনটি হচ্ছে বাবা ডাক। সবচাইতে বেশী প্রতিশব্দ বোধহয় ইংরেজি ভাষাতেই! ইংরেজরা বাবাকে ডাকেন, ফাদার, ড্যাড, ড্যাডি, পপ, পপা বা পাপা! ফিলিপিনো ভাষাও কম যায় না, এই ভাষায় বাবা হচ্ছেন তাতেই, ইতেই, তেয় আর আমা।
হিন্দি ভাষার বাবা ডাকটি অবশ্য কমবেশী সকলেই জানি,আর তা হল পিতাজী! আবার ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় যদি বাবা ডাকি তাহলে সেটা হবে- বাপা কিংবা আইয়্যাহ! জাপানিরা তাদের ভাষায় বাবাকে ডাকেন- ওতোসান, পাপা। পুর্ব আফ্রিকায় অবশ্য বাবাকে ‘বাবা’ বলেই ডাকা হয়! হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় পাপা ছাড়াও বাবা শব্দের অনেকগুলো প্রতিশব্দ আছে, যেমন- আপা, আপু, এদেসাপা।
এত এত ভাষার ভিড়ে আমরা জন্মদাতা এই মানুষটাকে “বাবা” বলে ডাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।আবার আমাদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু বাবাকে আদর করে হিব্রু ভাষাতেও ডাকি! হিব্রু ভাষায় বাবা হচ্ছে ’আব্বাহ্’ তার মানে আমরা যে ‘আব্বা’ বলে ডাকি তাই কিন্তু!
উইকিপিডিয়ার সূত্র হতে জানা যায় যে,‘বাবা দিবস’ পালন মূলত শুরু হয় গত শতাব্দীর প্রথমদিকে। আসলে মায়েদের পাশাপাশি বাবারাও যে তাদের সন্তানের প্রতি দ্বায়িত্বশীল- এটা বোঝানোর জন্যই এই দিবসের পালনের শুরু। পৃথিবীর সব বাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা প্রকাশের ইচ্ছা থেকে এই দিনটি বিশেষ ভাবে পালন করা শুরু।ধারণা করা হয়, ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই প্রথম ‘বাবা দিবস’ পালিত হয়। আমেরিকার পশ্চিম ভার্জেনিয়ার ফেয়ারমন্টের এক গির্জায় প্রথম এই দিনটি পালিত হয়। আবার সনোরা স্মার্ট ডড নামের ওয়াশিংটনের এক ভদ্রমহিলার মাথাতেও বাবা দিবসের আইডিয়া আসে। যদিও তিনি ১৯০৮ এর ভার্জিনিয়ার বাবা দিবসের কথা একেবারেই জানতেন না। ডড এই আইডিয়াটা পান এক গির্জায় পুরোহিতের বক্তব্য থেকে, সেই পুরোহিত আবার মা’কে নিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলছিলেন। তার মনে হয়, তাহলে বাবাদের নিয়েও তো কিছু করা দরকার। ডড আবার তার বাবাকে খুব ভালবাসতেন। তিনি সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগেই পরের বছর, অর্থ্যাৎ ১৯১০ সালের ১৯ জুন থেকে ‘বাবা দিবস’ পালন করা শুরু করেন।
আজ যেমন বাবা দিবস নিয়ে বিভিন্ন আয়োজন হচ্ছে প্রথমদিকে কিন্তু এতোটা ছিলো না। ‘বাবা দিবস’ বেশ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই পালিত হতো! ধীরে ধীরে অবস্থা পাল্টায়, ১৯১৩ সালে আমেরিকান সংসদে বাবা দিবসকে ছুটির দিন ঘোষণা করার জন্য একটা বিল উত্থাপন করা হয়। ১৯২৪ সালে তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কলিজ বিলটিতে পূর্ণ সমর্থন দেন। অবশেষে ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন বাবা দিবসকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে জুন মাসের তৃতীয় রবিবার ‘বাবা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
বাবাকে শুভেচ্ছা জানাতে কার্ড, গিফট হিসেবে ফাদারস ডে মগ, টি-শার্ট ইত্যাদি তৈরি করে থাকে গিফট কর্নারগুলো। পাশাপাশি এ দিবসকে ঘিরে নাটক, টকশো ইত্যাদি টিভি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।
যে বাবাকে ঘিরে এত আয়োজন পুরো বিশ্বব্যাপী,সেই জন্মদাতাও কালের স্রোতে আর নগরায়নের যাঁতাকলে পড়ে ‘থ’ বনে যান যখন বনবাসের মতো তাঁর স্থান হয় আধুনিক সভ্যতার নরকস্বরূপ ‘বৃদ্ধাশ্রম’-এ। তখন হয়ত আক্ষেপের সুরে গুমরে কেঁদে গেয়ে উঠেন-
“ছেলে আমার মস্ত মানুষ,মস্ত অফিসার
মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার।
নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামী দামী
সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি।
ছেলের আমার, আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম! ”



