চট্টগ্রাম বন্দরের সকল কার্যক্রম বন্ধ
জিএস নিউজ ডেস্কঃ>>>>
উপকূল অতিক্রমের অপেক্ষায় থাকা ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে সব কার্যক্রম। আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকার লোকজনকে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ চলাচলও।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় মোরা আজ সকাল নাগাদ কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ ও হাতিয়া হয়ে উপকূলরেখা অতিক্রম করতে পারে। গতিবেগ বাড়লে ঘূর্ণিঝড়টি উল্লিখিত সময়ের আগেও আঘাত হানতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় তীব্র ঝড় ও ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে।
আবহাওয়া পূর্বাভাসদাতা সংস্থা এসিসিইউওয়েদার জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় মোরার কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ১৫০ মিলিমিটারের (৬ ইঞ্চি) বেশি বৃষ্টিপাত এবং জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। ঘণ্টায় ১২৫ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা ঝড়টি উপকূলে পৌঁছার সময় যতটা শক্তিধারণ করবে, তার ওপর নির্ভর করবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান জানান, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। এছাড়া ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
ঘূর্ণিঝড়ের কারণে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে পণ্য ওঠানামা বন্ধ রয়েছে। উপকূলীয় জেলাগুলোয় প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়েছে। জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার অধিবাসীদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণ করতে গতকাল সকালে জরুরি বৈঠক করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। সিভিল সার্জন কার্যালয় ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকেও বিভিন্ন প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম উপকূলের ৪৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেয়া হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৮৮০ জন আশ্রয় নিতে পারবে। এছাড়া অনেক স্কুল-কলেজ ও সরকারি স্থাপনাও আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জেলা প্রশাসন জরুরি কন্ট্রোল রুম (নম্বর ৬১১৫৪৫) খুলেছে। ভূমিধসের আশঙ্কা থাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসরতদের সরে যেতে বলতে মাইকিং করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় চট্টগ্রাম প্রস্তুত। এরই মধ্যে সব উপজেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উপকূলীয় ছয় উপজেলার প্রত্যেকটিতে দেয়া হয়েছে ১০ টন চাল ও ৫০ হাজার টাকা। জনপ্রতিনিধিদেরও এ কাজে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।’
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেছেন, ‘বন্দরে সব ধরনের পণ্য ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়েছে। বন্দরের নিজস্ব সতর্কতা ৩ নম্বর অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। গতকাল সকালে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়।’
বন্দর সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙর মিলে ১২৭টি জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হয়েছে। গতকাল সকালে বন্দর জেটিতে ছিল বিভিন্ন পণ্যবাহী ১৬টি জাহাজ। বিকাল ৫টা পর্যন্ত পণ্য খালাস হলেও পরে বৃষ্টির কারণে তা বন্ধ রাখা হয়। দুর্ঘটনা এড়াতে বন্দর চ্যানেল থেকে জাহাজ সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া বন্দরের কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. মো. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, জেলার সব চিকিৎসক-নার্সের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া জেলার ২৮৪টি মেডিকেল টিমকে ওষুধ নিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় অন্যান্য প্রস্তুতির পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) জরুরি কন্ট্রোল রুম (০৩১-৬৩০৭৩৯, ৬৩৩৬৪৯) খুলেছে।
চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ বসাক বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসতে করা হয়েছে মাইকিং। উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত চসিকের আঞ্চলিক অফিস, ওয়ার্ড কার্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রাখা হয়েছে।’
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন গতকাল জরুরি প্রস্তুতি সভা করেছে। সভায় জেলার হাতিয়া, সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাটসহ নয়টি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দেয়া হয়।
জেলা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ইউনিট অফিসার সৈয়দ আফরিদুল ইসলাম বলেছেন, নোয়াখালী জেলার ২৭৪টি সাইক্লোন শেল্টার ও ৬ হাজার ২৫০ জন স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত, ১০২টি মেডিকেল টিম গঠন, পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুদ এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের নিয়ে প্রস্তুতি সভা করেছেন জেলা প্রশাসক হোমায়রা বেগম। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় জেলা ও উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।
মংলা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বন্দরে অবস্থানরত নয়টি বিদেশী জাহাজে পণ্য ওঠানামা বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। বন্দরের হারবার মাস্টার কমান্ডার মো. ওলিউল্লাহ বলেছেন, উপকূলে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার এরই মধ্যে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে।
মংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় মংলা উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও বন্দর কর্তৃপক্ষ তিনটি পৃথক কন্ট্রোল রুম খুলেছে। এছাড়া প্রস্তুত রাখা হয়েছে উপজেলার ৪২টি সাইক্লোন শেল্টার।
ভারতীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থা স্কাইমেট ওয়েদার বলেছে, উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়টি আজ ৯১ ডিগ্রি অক্ষরেখা ও ৯২ ডিগ্রি অক্ষরেখার মাঝামাঝি পথে বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করবে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্রের পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।



