আলোচিত টিভি সিরিয়াল ‘ইউসুফ-জুলেখা’ দেখলে সত্যিই কী ‘ঈমান-আমল’ নষ্ট হতে পারে!
বিনোদোন ডেক্স:>>>>>>
ইতিবাচক ও নেতিবাচক যে কারনেই হোক বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে একটি টিভি সিরিয়াল। একদল বলছে ঘটনা ‘ভয়াবহ’ রকম অসত্য! একদল বলছে সত্য। দুইদলের বাদানুবাদ আর তর্কে সরগরম হচ্ছে বিশ্ব মিডিয়া। স্পর্শকাতর এমন বিষয়ে আলোচিত দু’দলে বিভক্ত দর্শকদের বাকযুদ্ধ ক্রমশ বাতাসে ছড়াতে থাকে ‘কৌতুহল’ হয়ে । এরপর অবধারিতভাবেই পক্ষে অথবা বিপক্ষে কোথাও নেই শুধুমাত্র ‘কৌতুহল” থেকেই তৈরি হয় আরও একভাগ দর্শক।
কাটতি বাড়ে সিরিয়ালের ! ——– প্রতিনিয়ত এমন অনেক কিছুই চলে আসছে, চলছে- হয়ত চলবেও … সত্য-মিথ্যা যাইহোক, ‘সফলতার’ শেষ হাঁসি ফোটে সিরিয়ালের আয়োজকদের মুখেই! এসব বিষয় অবশ্য দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। সে বিষয়ে আলোকপাতের উদ্দেশ্যও নেই আমাদের।
চলুন আমরাও বরং ‘স্রোতে গাঁ ভাসাই’ কিছুক্ষণ! আজ ’জি এস নিউজ’ পাঠকদের জন্য ‘ইউসুফ-জুলেখার’ গল্প নিয়ে সময়সাময়িক তর্ক-বিতর্ক নিয়ে একটি গুরুত্বপুর্ন আলোচনায় আলোকপাত করা যাক। প্রিয় পাঠক, একজন সচেতন মানুষ হিসেবে এ প্রসঙ্গে ‘যৌক্তিক ব্যখ্যা’ সহ জানতে চাই আপনার ভাবনা। আপাতত আলোচনার শুরুতে ধরে নেয়া যাক আপনি/ আমি/ আমরা তৃতীয়পক্ষ । দেখা যাক, সবকিছুর মুল্যায়ন করে কোথায় আসে আপনার অবস্থান।
পক্ষে না বিপক্ষে ?
বিশ্বের বেশ কয়েকটি ভাষায় ডাবিং করে নির্মিত টিভি সিরিয়াল ‘ইউসুফ-জুলেখা’ নিয়ে আলোচনা আর সমালোচনা চলছে গোটা বিশ্বজুড়েই। পবিত্র কোরআন শরীফে উল্লেখিত ইউসুফ নবীর প্রেম-বিয়ে- বিরহসহ সেই সময়ের প্রেক্ষাপট নিয়ে এই ‘ঐতিহাসিক’ সিরিয়াল নির্মিত হয়েছে এমন ‘দাবী’কে অসত্য, ভিত্তিহীন ও মনগড়া উল্লেখ করে একভাগ দর্শক বলছেন, এই মিথ্যাচার এখুনি বন্ধ হোক, কেও বলছেন এই সিরিয়াল দেখলে রীতিমত ঈমান নষ্ট হবে মুসলমানদের ।
এই সিরিয়ালে দেখানো ঘটনা ‘মিথ্যে দাবী করে অন্যদিকে এই সিরিয়ালের জনপ্রিয়তায় বুদ হয়ে আর এক ভাগ দর্শকের দাবীমতে এসব ঘটনা সত্যি। দেখা ও জানার ভেতরে কোন পাপ নেই। বাংলায় ডাবিং করা সিরিয়ালটি পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত মুসলমানদের নবী হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এবং তার পুত্র ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে নির্মিত বলে জানিয়েছেন এই সিরিয়ালের নির্মাতা। জানা গেছে, ফার্সিতে এ ধারাবাহিকের নাম ‘ইউসুফ পয়গম্বর’। এর আগে এ ধারাবাহিকটি লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও আফগানিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্প্রচারিত হবার সময় থেকেই আলোচনার শুরু।
বিশ্বজুড়ে এমন তুমুল আলোচনার মধ্যেই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রচারিত হচ্ছে জনপ্রিয় বেসরকারি একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে । সপ্তাহে পাঁচদিন– রবি থেকে বৃহস্পতিবার রাতে প্রচারিত হচ্ছে সিরিয়ালটি ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মুমিত আল রশিদ সিরিয়ালটির বাংলা অনুবাদের মুল দায়িত্বে রয়েছেন। আলোচিত এই সিরিয়ালের বাংলা অনুবাদ করার সুবাদে নিজের অনুভুতির কথা জানিয়ে বলেছেন, “সিরিয়ালটি অনুবাদ করতে গিয়ে আমি কখনো আবেগে কেঁদেছি, কখনও হেসেছি। চমৎকার একটি সিরিয়াল। ধারাবাহিকের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পোশাক-পরিচ্ছদে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার লেশ মাত্র নেই।”
তিনি জানান , “ধারাবাহিকটিতে বর্তমান বাংলাদেশে প্রচলিত সিরিয়ালগুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নমাত্রা রয়েছে। কোন ধর্মের প্রতি কোনরূপ বিরূপ ধারণা পোষণ বা আঘাত করা হয় নি।” তার মতে, এটি সব ধরণের দর্শককেই মন্ত্রমুগ্ধ করবে। এ ধারাবাহিকে প্রাচীন শহর বাবেল, কেনান, শাম, মিশর সর্বোপরি আরব দেশের প্রাচীন ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাবেন একজন দর্শক।
ধারাবাহিকটি দর্শকদেরকে ইতিহাসের আনাচে-কানাচে নিয়ে যাবে দাবী করে তিনি আরও বলেন প্রাচীন দাস প্রথা, বানিজ্যিক ভ্রমণ, খাবার-দাবার সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে ।
অন্যদিকে গতকিছুদিন ধরেই ইউসুফ-জুলেখা সিরিয়াল বন্ধের দাবীতে সোচ্চার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। প্রতিবাদ ছড়িয়েছে চুড়ান্ত প্রতিরোধের পর্যায়ে প্রায়।
এই সিরিয়াল বন্ধের দাবীতে সমমনাদের একাট্টা করতে ফেসবুকে একটি ইভেন্ট চলছে। ইভেন্টে জানানো হচ্ছে,
নবী ইউসুফ (আঃ) এর চরিত্রকে কলংকিত করতে এবং তথাকথিত নাজায়েজ প্রেম ভালবাসাকে জায়েজ করতে এসএ টিভি বাংলাদেশ চ্যানেলে “অমর প্রেমকাহিনী ইউসুফ জুলেখা” শিরোনামে একটি ধারাবাহিক মেগা সিরিয়াল সম্প্রচারিত হচ্ছে। এই নাটকে একজন পবিত্র চরিত্রের নবী,আল্লাহর দ্বীনের দাঈ,একত্ববাদের প্রচারকের নামে কল্পিত,বানোয়াট,মিথ্যা ও নোংরা কাহিনী প্রচার করা হচ্ছে।মুসলিম প্রধান ধর্মভীরু ওলি আউলিয়ার দেশে একজন নবীর নামে মিথ্যা ও বানোয়াট প্রেম কাহিনীর অপপ্রচার বরদাশত করা হবেনা।
প্রতিবাদকারীরা ইভেন্টে জানাচ্ছেন, নাজায়েজ প্রেম ভালবাসা,শারিরীক সম্পর্ককে উৎসাহিত করতে পবিত্র ইসলামের নামে এরকম মিথ্যা অপপ্রচার যুবসমাজের নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয় ঘটাবে। এর ফলাফল মারাত্মক আকার ধারন করবে।
প্রতিবাদকারীদের দাবী, এই সিরিয়ালের ফলে সমাজে বেহায়াপনা,অশ্লিলতা,ব্যভিচার বৃদ্ধি পাবে। দীনি এলেমের ঘাটতির দরুন যুবসমাজ প্রেম ভালবাসাকে জায়েজ মানা শুরু করবে বলে আশংকার কথাও জানানো হয় । একইসাথে ‘ইউসুফ জুলেখার’ নামে বানোয়াট ও কল্পিত প্রেমকাহিনীর বিরুদ্ধে সত্য দলিল হিসেবে দাবী করে একটি ফিচার তুলে ধরেছেন প্রতিবাদীরা।
#পবিত্র কুরআনের আলোকে ইউসুফ (আঃ) এর প্রেমকাহিনীর বাস্তবতাঃ
আমাদের দেশের অনেকেরই ধারণা (বিশেষ করে যুবক-যুবতীদের) ইউসুফ-জোলেখার মধ্যে প্রেম ছিল। তাই তারা যুক্তি দেখায় প্রেম-ভালবাসা পবিত্র। ইউসুফ (আঃ) যদি নবী হয়ে প্রেম করতে পারে তবে আমরা কেন করব না।
কিন্তু……
এই কথা গুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বানোয়াট। এই মিথ্যা কল্প-কাহীনি তারাই পেশ করে থাকে যাদের অন্তরে বক্রতা আছে, যাদের মনে কু-লিপ্সা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্র নবী ইউসুফ (আঃ) এই ধরনের কু-কর্ম থেকে অনেক পবিত্র। তিনি ছিলেন আল্লাহ্ভীরু। তিনি কখনোই জোলেখার সাথে কোন সম্পর্ক করেন নি।
ইউসুফ (আঃ) কে যখন আজিজ নামক এক বাদশা কাছে কৃতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয় তখন ইউসুফ (আঃ) ঐ বাদশার নিকটে লালিত-পালিত হতে থাকে। আর জোলেখা ছিল ঐ বাদশা আজিজের স্ত্রী।
মহান আল্লাহ্ বলেনঃ ‘আর সে যে মহিলার বাড়ীতে থাকত, ঐ মহিলা তাকে ফুসলাতে লাগল এবং (একদিন) দরজা সমূহ বন্ধ করে দিয়ে বলল, কাছে এসো! ইউসুফ বলল, আল্লাহ আমাকে রক্ষা করুন! তিনি (অর্থাৎ আপনার স্বামী) আমার মনিব। তিনি আমার উত্তম বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয়ই সীমা লংঘনকারীগণ সফলকাম হয় না’ (২৩)। ‘উক্ত মহিলা তার বিষয়ে কুচিন্তা করেছিল এবং ইউসুফ তার প্রতি (অনিচ্ছাকৃত) কল্পনা করেছিল। যদি না সে স্বীয় পালনকর্তার প্রমাণ অবলোকন করত’ । এভাবেই এটা এজন্য হয়েছে যাতে আমরা তার থেকে যাবতীয় মন্দ ও নির্লজ্জ বিষয় সরিয়ে দেই। নিশ্চয়ই সে আমাদের মনোনীত বান্দাগণের একজন’ (২৪)।
‘তারা উভয়ে ছুটে দরজার দিকে গেল এবং মহিলাটি ইউসুফের জামা পিছন দিক থেকে ছিঁড়ে ফেলল। উভয়ে মহিলার স্বামীকে দরজার মুখে পেল। তখন মহিলাটি তাকে বলল, যে ব্যক্তি তোমার স্ত্রীর সাথে অন্যায় বাসনা করে, তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা অথবা (অন্য কোন) যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেওয়া ব্যতীত আর কি সাজা হ’তে পারে’? (২৫)। ‘ইউসুফ বলল, সেই-ই আমাকে (তার কুমতলব সিদ্ধ করার জন্য) ফুসলিয়েছে।
তখন মহিলার পরিবারের জনৈক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল যে, যদি ইউসুফের জামা সামনের দিকে ছেঁড়া হয়, তাহ’লে মহিলা সত্য কথা বলেছে এবং ইউসুফ মিথ্যাবাদী’ (২৬)। ‘আর যদি তার জামা পিছন দিক থেকে ছেঁড়া হয়, তবে মহিলা মিথ্যা বলেছে এবং ইউসুফ সত্যবাদী’ (২৭)। ‘অতঃপর গৃহস্বামী যখন দেখল যে, ইউসুফের জামা পিছন দিক থেকে ছেঁড়া, তখন সে (স্বীয় স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে) বলল, এটা তোমাদের ছলনা। নিঃসন্দেহে তোমাদের ছলনা খুবই মারাত্মক’ (২৮)। (অতঃপর তিনি ইউসুফকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,) ‘ইউসুফ! এ প্রসঙ্গ ছাড়। আর হে মহিলা! এ পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চিতভাবে তুমিই পাপাচারিনী’ (ইউসুফ ১২/২৩-২৯)।
#নবী_ইউসুফ (আঃ) এর নামে কল্পকাহিনীঃ
পবিত্র কালামে পাকের হিসাবে ঘটনা এখানেই শেষ কিন্তু পনেরো শতকে শাহ মুহম্মদ সগীর ইউসুফ-জুলেখা নামে একটি তথাকথিত বিকৃত রোমান্টিক একটি কাব্য রচনা করেন।প্রেমের মাধ্যমে ধর্মের বাণী শোনাবার জন্য দীর্ঘ এ আখ্যানকাব্য রচনা করেন।বাংলা কাহিনীকাব্যে ধর্মভাবের পাশাপাশি কাল্পনিক মানবপ্রেমের নাজায়েজ আবেগ-উচ্ছ্বাস প্রকাশিত হয়েছে।গ্রন্থের শেষে ইউসুফের ভ্রাতা ইবন আমিন ও বিধুপ্রভার কাল্পনিক প্রেমকথা আছে। এটি কবির নতুন সংযোজন।
শাহ মুহম্মদ সগীর ছাড়াও মধ্যযুগে আবদুল হাকিম, শাহ্ গরীবউল্লাহ, গোলাম সফাতউল্লাহ, সাদেক আলী ও ফকির মোহাম্মদ ইউসুফ-জুলেখা কাব্য রচনা করেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম দুজন বাংলা এবং অন্যরা দোভাষী পুথির মিশ্র ভাষা ব্যবহার করেন। ফারসি ভাষায় ফেরদৌসী (১১শ শতক) ও জামী (১৫শ শতক) ইউসুফ-জুলেখার প্রেমকথা অবলম্বনে সুফি অধ্যাত্মতত্ত্বের কাব্য রচনা করেন।
ইভেন্টে জানানো হছে, ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র মতে এসব বানোয়াট তথ্য পরবর্তীতে সংযোজন,বিয়োজনের মাধ্যমে বিকৃত এক কাহিনীকল্প সাজানো হয়েছে যা মূলত কুরআন বিকৃতির শামিল অপরাধ। ইসলাম ধর্মের ন্যায় পবিত্র ধর্মে হারাম সম্পর্কের কোনো স্থান নেই। এসএ টিভি হীন উদ্দেশ্যে যুবসমাজের চরিত্র হনন করতে যে অন্যায় পন্থা বেছে নিয়েছেন,অবিলম্বে তার সম্প্রচার বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রতিবাদকারী অনলাইন একটিভিস্টরা জানান, কিছুদিন পূর্বে সুলতান সুলেমান নামক বিদেশী একটি ডাবিং মেগা সিরিয়াল বন্ধ করা হয়েছে,সুতরাং ধর্মপ্রান মুসলমান ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করলে কতৃপক্ষ এই মেগা সিরিয়াল বন্ধ করতে বাধ্য হবে ইনশাল্লাহ।সকল ধর্মপ্রান তৌহিদী মুসলিমদের সকলের নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবাদের আহবান জানান তারা …..।
গতকাল ৭ মে ইসলামবিষয়ক একটি প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে টেলিফোনে দর্শকের করা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর ও আলোচনার সময় উঠে আসে আলোচিত টিভি সিরিয়ালের বিষয়টি। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, পরিবার, সমাজসহ জীবনঘনিষ্ঠ ইসলামী অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক জয়নুল আবেদীন আজাদের সাথে এই অনুষ্ঠানে সেদিন ছিলেন বিশিষ্ট আলেম ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দর্শক ইউসুফ জুলেখার প্রেমের কাহিনীর সিরিয়ালটি দেখা ঠিক হবে কি না, সে সম্পর্কে টেলিফোনে জানতে চান। ঐ দর্শক প্রশ্ন করেন ‘ আমরা যে টেলিভিশনে একটা সিরিয়াল দেখি ‘ইউসুফ জুলেখা’ বা ইউসুফ-জুলেখার কাহিনী, এতে কি আমাদের গুনাহ হচ্ছে?’
এমন প্রশ্নের উত্তরে বিশিষ্ট আলেম ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ প্রথমেই বলেন, ইউসুফ (আ.) একজন নবী ছিলেন। সব আলেমরা একমত যে, নবীদের কোনো ছবি ধারণ করা যাবে না, কোনো ছবি আঁকা যাবে না। বিশেষ করে যেসব নবীর কথা আমাদের কোরআন এবং হাদিসের মধ্যে এসেছে, আর যেগুলো ইহুদিদের বইতে এসেছে সেগুলো আলাদা কথা।
সিরিয়ালটির মুখ্যচরিত্র ‘জুলেখা’র বিষয়ে তিনি জানান, কোরআন এবং সুন্নাহে কোথাও জুলেখা শব্দটি আসেনি। আরো সমস্যা হচ্ছে, এগুলোকে অমর প্রেম কাহিনী বলা হচ্ছে। অথচ এ রকম কোনো ঘটনা কিন্তু ঘটেনি। সেখানে প্রেমের এই বিষয়টি ছিলই না।
তিনি বলেন, কোরআনে কারিমে আমাদের যেসব নবী এবং রাসুলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের ব্যাপারে কোনো কথা বলতে গেলে, প্রত্যেকটি কথা হতে হবে কোরআন এবং সুন্নাহর মাপকাঠিতে সাব্যস্ত। তবে টেলিভিশনের এসব কাহিনীতে বিভ্রান্তি আছে, ভুল আছে, মিথ্যা আছে এমন কথাও জানান ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ ।
এরপর ঐ দর্শকের প্রশ্নের জবাবে আলোচক জানান, পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে একপক্ষীয় একটি বিষয়। সীমালঙ্ঘনের বিষয় ছিল আজিজের স্ত্রীর পক্ষ থেকে কিন্তু ইউসুফকে (আ.) আল্লাহতায়ালা সেখান থেকে রক্ষা করেছেন। তিনি ওই দিকে যাননি, ওইখান থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। এরপর তাঁদের মধ্যে বিয়ে হয়েছে, এটিও কোরআন-হাদিসে আসেনি। তাহলে আমরা কেন এমন কথা প্রচার করি, এমন কথা কেন আলোচনা করি, যে বিষয়টি কোরআন এবং সুন্নাহ নির্ভরশীল নয়।
একনজরে ইউসুফ-জুলেখার পুরো গল্প যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে সিরিয়ালে।
পবিত্র কোরআনে সূরা ইউসুফের বর্ণনা মতে, হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালাম, তাঁর ছেলে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম। হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে জন্ম নেন ইউসুফ।
হযরত ইয়াকুব তার গোত্রের লোকদের কথিত ঈশ্বর ‘ইশতারের’ উপাসনা ছেড়ে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের আহ্বান জানান। লোকেরা তাকে নানাভাবে অপদস্থ করলেও, দমে যাননি তিনি। কিন্তু আল্লাহর দৈব সাহায্যের নিদর্শন দেখে, লোকেরা সাড়া দেন তাঁর আহ্বানে।
ছোটবেলায় ইউসুফের মা মারা যান। সুদর্শন শান্ত স্বভাবের ইউসুফকে বাবা ইয়াকুব আলাইহিস সালাম খুবই ভালোবাসতেন। একারণে সৎ ভাইদের রোষানলে পড়েন ইউসুফ। ভাইয়েরা তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়।
একটি কুপের মধ্যে ফেলে দেয়া হয় শিশু ইউসুফকে। বাঘ ইউসুফকে খেয়ে ফেলেছে বলে বাবাকে মিথ্যা কথা বলে সৎ ভাইয়েরা। কিন্তু একটি কাফেলা ইউসুফকে ওই কুয়া থেকে উদ্ধার করে– মিসরের রাজার কাছে বিক্রি করে দেয়।
রাজ দরবারে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেন ইউসুফ। তাঁর রুপ, গুণ ও আচার ব্যবহারের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যেজুড়ে। রাজার স্ত্রী জুলেখা, ইউসুফের রুপ ও যৌবনে মুগ্ধ হয়ে তাঁর প্রেমে পড়েন। খবরটি অভিজাত মহলে জানাজানি হলে, শুরু হয় রাণীর সমালোচনা।
রানী একদিন মহিলাদের রাজমহলে আমন্ত্রন জানান। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি ছুড়ি ও একটি করে ফল দিয়ে সবাইকে ফল কাটার আহবান জানান। এসময় ইউসুফ ওই কক্ষে প্রবেশ করলে– সবাই অবাক হয়ে যান এবং ফলের পরিবর্তে সবাই নিজ নিজ আঙ্গুল কেটে ফেলেন।
কু-প্রস্তাবে ইউসুফ সাড়া না দেয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন রানী। ঘটনাচক্রে জেলে বসে রাজা এবং অন্যান্যের দু’একটি স্বপ্নের সত্য ব্যাখ্যা দেয়ায় তাকে মুক্তি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী করেন রাজা। ক্রমে ঘটনা গড়াতে থাকে। একপর্যায়ে পিতা ইয়াকুব সহ তাঁর ভাইদের সাথে মিলন হয় ইউসুফের। এভাবেই সুখ-দুঃখ, ঘাত প্রতিঘাত, প্রেম-ভালোবাসার মধ্য দিয়ে এগুতে থাকে ইরানের বিখ্যাত এই টিভি সিরিয়াল ‘ইউসুফ পয়গম্বর’ এর কাহিনী।



