১৯৯৪ সালে হঠাৎ ভালোবাসা দিবস নিয়ে সোরগোল পড়লো। ‘ভ্যালেনটাইন’স ডে’ -কে ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নাম দিয়ে সাপ্তাহিক যায়যায় দিন জোর প্রচার চালাতে লাগল। বইমেলায় যায়যায় দিন একটা স্টল নিল। সেখান থেকে বিক্রি হতে লাগলো ভালোবাসার হরেক রকম কার্ড, নানারকম স্টিকার, মগ, ছবির ফ্রেম আরও অনেক কিছু। সেখানে বিক্রি হল সার্টিফিকেট অফ লাভ। এই ‘প্রত্যয় পত্র’ বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত বইমেলার বিভিন্ন স্টলে পাওয়া গেছে। এটি হল হুবহু বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স সার্টিফিকেটের মতো একটি সার্টিফিকেট। যেখানে নিজের প্রেমিক/প্রেমিকার নাম বসিয়ে তলায় উপহারদাতা সই করে দিবে। মুখরোচক ঝালমুড়ির মতো সেসব সার্টিফিকেট বইমেলায় বিকোত।
নব্বই দশকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। তখন আমরা দলবেঁধে পহেলা ফাল্গুন এবং ভ্যালেনটাইন’স ডের বিকেল বেলা যেতাম বইমেলায়। একে অন্যকে কিনে দিতাম বই। বন্ধুদের মধ্যে যারা ছিল জুটি তারা সেদিনটি বিশেষ উপহার দিত। আর হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলনের বই কিনে উপহার দিত। ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘ও রাধা ও কৃষ্ণ’ ইত্যাদি বই দিত একজন অন্য জনকে। আবার কবিতার বই, কবিতার ক্যাসেটও খুব চলতো উপহার হিসেবে। পুর্ণেন্দু পত্রীর ‘কথোপকথন’ এর আবৃত্তির ক্যাসেট ছিল চাহিদার শীর্ষে। আরও ছিল ‘ভালোবাসার কবিতা’ বা এ ধরনের ক্যাসেট।
সুমন চট্টোপাধ্যায়ের ‘তোমাকে চাই’ এর ছিল বিপুল চাহিদা। কোনো কোনো জুটি ভ্যালেনটাইন’স ডে সেলিব্রেট করতো চায়নিজ রেস্টুরেন্টে। আর বন্ধুবান্ধব দল বেঁধে যেতাম নাজিমুদ্দিন রোডের নীরব হোটেলে।
ধীরে ধীরে দেখছি ভ্যালেনটাইন’স ডে’র বিশেষ টিভি প্রোগ্রাম, পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা। যা আমার কাছে মনে হয় এগুলো ভালোবাসার বাণিজ্যিকীকরণ।
‘কৃষ্ণপ্রেম কি মুখের কথা, কুড়িয়ে পাবি যথা তথা’। ভালোবাসা এত সহজ নয় যে একদিন গোলাপ ফুল উপহার দিয়েই বলে দেওয়া যায় ‘আমি ভালোবাসি’। ভালোবাসার প্রমাণ দিতে হয় সারা জীবন ধরে। ভ্যালেনটাইন’স ডে উদযাপনের নামে পথে ঘাটে যেভাবে গোলাপফুল বিক্রির হিড়িক পড়ে, জুটিদের ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় এমনটি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছিল অকল্পনীয়।
ভালোবাসা বিষয়ে আমার একান্ত ব্যক্তিগত মত হলো ‘তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম’ কিংবা ‘গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি’ হলেই যেন ভালোবাসা গভীর হয়। এতো অনন্তঃশীলা নদী। প্রকাশ্যে কুল ছাপিয়ে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেলেই তাতে পলি পড়ে বেশি করে। ‘প্রকাশ্যে চুমু’, ‘প্রকাশ্যে প্রোপোজ’ আমি এগুলোর সমর্থক নই। নিভৃতে থাকলেই ভালোবাসার সৌন্দর্য আমার কাছে বেশি বলে মনে হয়। ভিন্ন মত থাকতেই পারে।
তবে উৎসব, অনুষ্ঠান, প্রাণোচ্ছ্বলতা এগুলো ভালোই লাগে। আমি ভালোবাসা দিবস কীভাবে উদযাপন করি? সুন্দর সাজসজ্জা করি, শাড়ি পরি। চলে যাই বইমেলায়। ঘরে ফিরে রবীন্দ্রসংগীত শুনি। ‘রোমান হলিডে’, ‘ক্যাসাব্লাংকা’, ‘সিলসিলা’, ‘দেবদাস’, ‘সাগরিকা’-এর মতো কোনো ক্ল্যাসিক প্রেমের ছবি দেখি।
পড়ি ‘শেষের কবিতা’ কিংবা ও’হেনরির কোনো ছোটগল্প। ‘বনলতা সেন’, ‘কুড়ি বছর পরে’, ‘নীরার জন্য’ আমাকে এখনও ভালোবাসায় ডোবায়।
বিশ্বে ঘৃণা, যুদ্ধ, হানাহানির তো শেষ নেই। বছরে একটি দিন নাহয় রইলোই ভালোবাসার জন্য।
তবে একটি দিন মাত্র নয়। সবসময়েই প্রিয়জনের জন্য কেয়ারিং হওয়া, সামগ্রিকভাবে মানুষকে ভালোবাসা, প্রকৃতিকে ভালোবাসা এবং আমাদের এই সুন্দর বিশ্বকে ভালোবাসা- এক জীবনে এর চেয়ে বেশি কিছুর প্রয়োজন আছে কি!