ডিজিটাল বাংলাদেশ গুজবের জন্য নয়: প্রধানমন্ত্রী
জিএস নিউজ ডেস্ক:>>>
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গুজব ছড়ানো থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ তিনি মিথ্যা অপ্রচারের জন্য গড়েননি।
রোববার ঢাকার শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজসংলগ্ন বিমানবন্দর সড়কে আন্ডারপাস নিমার্ণ কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারপ্রধানের এ আহ্বান আসে।
ঢাকার কুমিের্টালার এই কলেজের দুই শিক্ষাথীর্ বাসচাপায় নিহত হলে পুরো রাজধানী অচল করে দিয়ে টানা এক সপ্তাহ বিক্ষোভ দেখায় বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। একপযাের্য় বিভিন্ন গুজব ছড়ানো হলে ঘটনাপ্রবাহ সহিংসতায় গড়ায়।
আন্ডারপাস নিমার্ণকাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রমিজ উদ্দিন কলেজের শিক্ষক-শিক্ষাথীর্ অভিভাবকদের সামনে রেখে দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা গুজবে কান দিয়েন না। ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি সুশিক্ষার জন্য। অশ্লীল কথা, মিথ্যা কথা, গুজব- এসবের জন্য না। কাজেই এর থেকে বিরত থাকতে হবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা বাঙালিরা একটু হুজুগে মাতি। একটা কথা বলব, সোশ্যাল মিডিয়া। ডিজিটাল বাংলাদেশ তো আমি করে দিয়েছি। সকলের হাতে এখন মোবাইল ফোন। আধুনিক প্রযুক্তি ফোর-জি এসে গেছে। একটা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফেসবুক করা যায়, ইউটিউব দেখা যায়, সেটা আমরা করে দিয়েছি।
‘এই যে প্রযুক্তির ব্যবহার, এর মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে, গুজব ছড়িয়ে, একটা অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা; এমনকি অনেক বয়স্ক লোক, এমন এমন লোক আছে- যাদের ভালো কাজের জন্য একসময় পুরস্কার দিয়েছি, অথচ তারাই যখন এ ধরনের গুজব ছড়াতে শুরু করল। আর যাই হোক, এগুলো তো কখনো সহ্য করা যায় না। কেউ চট করে গুজবে কান দেবেন না।’
রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষাথীর্র মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচারে নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা কোনো দিনই ক্ষমা করা যায় না, এটা ক্ষমার অযোগ্য। কারণ ওই বাস ড্রাইভার যেভাবে নিয়ম ভঙ্গ করে গাড়িটা চালাচ্ছিল, ছেলেমেয়েদের ওপর দিয়ে চলে গেল। অনেক ছেলেমেয়ে আজ আহত।
‘এদের আমরা কখনোই ক্ষমা করব না। এই দুঘর্টনায় যারা জড়িত তাদের উপযুক্ত শাস্তি অবশ্যই হবে, আমরা তা দেব।’
গত ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কের এমইএস এলাকায় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হয় রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষাথীর্ দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজীব।
তারপর নিরাপদ সড়কের দাবিতে সড়কে আন্দোলনে নামে শিক্ষাথীর্রা; সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। তাদের অন্যতম দাবি ছিল সড়কে মৃত্যুর জন্য দায়ী বেপরোয়া চালকদের মৃত্যুদÐের আইন করা।
ওই আন্দোলনের মুখে সরকার দীঘির্দন ধরে ঝুলে থাকা সড়ক নিরাপত্তা আইনের যে খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করেছে, সেখানে দুঘর্টনায় মৃত্যুর জন্য সবোর্চ্চ সাজা তিন বছর থেকে বাড়িয়ে পঁাচ বছর করার কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষাথীর্রা রাস্তায় নেমে যেভাবে চোখে আঙুল দিয়ে অনেক অনিয়ম দেখিয়ে দিয়েছে, অনুষ্ঠানে তাদের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি যারা গুজবে কান দিয়ে অস্থিরতা বাড়িয়েছে, তাদের সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ‘একেকটি ঘটনা মানুষের চোখ খুলে দেয়। তারপরও দেখছি, আমাদের কিছু এখনো অন্ধ। আমরা সরকারে ফিরে দেখেছি, বিআরটিসি বাস বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা ছিল, আমরা চালু রেখেছি।
‘ড্রাইভারদের ট্রেইনিংয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক, ড্রাইভাররা ট্রেইনিংও করে না, হেলপারের ওপরে গাড়ি ছেড়ে দেয়।’
শিক্ষাথীের্দর আন্দোলনের তৃতীয়পক্ষ সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছিল মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঘটনা ঘটার পর যেভাবে শিক্ষাথীর্রা নেমে এসেছিল, তারা যে প্রতিবাদ করেছেÑ সাথে সাথে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, সবাইকে বলেছি ধৈযর্্য ধরতে।
‘আমরা দেখেছি, তোমরা অস্থির হয়ে যাচ্ছ, তবুও ধৈযর্্য ধরতে বলেছি। আমরা দেখেছি, আমাদের ছেলেমেয়েরা রাস্তায়, তাদের যাতে কোনো দুঘর্টনা না ঘটে।’
একটি চলন্ত বাসের ওপর এক শিক্ষাথীর্ উঠে পড়ার বাস বন্ধের সিদ্ধান্ত এসেছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সাথে সাথে বললাম, বাস চালানো যাবে না, এগুলা বন্ধ কর। দুটি দিন তাদের নিরাপত্তা দেয়ার অনেক চেষ্টা করেছি।’
কিন্তু আন্দোলনের তৃতীয় দিন রাস্তায় স্কুল ড্রেস পরিবতের্নর দৃশ্য দেখা গেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন দেখলাম ব্যাগের ভেতর থেকে চাপাতি, চায়নিজ কুড়াল বের হচ্ছে, পাথর বের হচ্ছেÑ তখন আমরা চিন্তিত হয়ে গেলাম।
‘আমি তখনই আহ্বান করলাম, তোমরা ঘরে ফিরে যাও। অভিভাবক-শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানালাম- তৃতীয়পক্ষ ঢুকে পড়েছে, তাদের ঘরে ফিরিয়ে নেন। সময়মতো তারা শিক্ষাঙ্গনে ফিরে গেছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘মার খেয়েছে, অপমাণিত হয়েছে, তাদের মোটরসাইকেল পোড়ানো হয়েছে’, কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে কেউ কিছু করেনি।
‘কিন্তু দেখা গেল- এরা ছাত্র না, ছাত্র নামধারী কিছু লোক। ওই যে দজির্র দোকানে খেঁাজ নিয়ে জানা গেল, প্রচুর পরিমাণে স্কুল ড্রেস তৈরি হচ্ছে।’
শিক্ষাথীর্সহ সবাইকে রাস্তা পারাপারে সতকর্ থাকার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাস্তা পারাপার করার জন্য ডানে বা বামে তাকাতে হবে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য যেসব জায়গা আছে- আন্ডারপাস, ওভারব্রিজ কিংবা যেখানে জেব্রা ক্রসিং সেখান দিয়ে রাস্তা পার হতে হবে।’
বাস স্টপেজ ছাড়া কোথাও যাত্রী ওঠানামা করার বিষয়ে হুশিয়ার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা সেটা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, শাস্তি দিতে হবে এবং লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। আর ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলতে পারবে না।’
তিনি বলেন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেশি মানুষের চলাফেরা যেখানে- প্রতিটি জায়গায় আন্ডারপাস, ফুটওভার ব্রিজ করে দিতে হবে। পযার্প্ত লাইট ও গোপনভাবে সিসি ক্যামেরা রাখতে হবে। এবং তা মনিটরিং করতে হবে।
‘ছোট্ট সোনামণিদের বলব, ট্রাফিক রুলস মেনে চলতে হবে, মন দিয়ে পড়ালেখা করতে হবে। এত কষ্ট করছি, তোমাদের ভবিষ্যৎ নিমাের্ণর জন্য কাজ করে যাচ্ছি।’
অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘একটি মহল গুজব রটিয়ে উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করে, তারা ভবিষ্যতেও করতে পারে। সেদিকে সবাইকে নজর রাখতে হবে। শিক্ষাথীের্দর নজর রাখতে হবে, তারা কেউ যাতে নিয়ম ভঙ্গ না করে।’
রমিজ উদ্দিন কলেজের সামনের এই আন্ডারপাস ছাড়াও ঢাকায় আরও তিনটি আন্ডারপাস নিমার্ণ করা হবে বলে অনুষ্ঠানে জানান সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
এর মধ্যে বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে ঢাকা বিমানবন্দর পযর্ন্ত একটি এবং সংসদ সদস্য ভবন থেকে সংসদ ভবন পযর্ন্ত অরেকটি আন্ডারপাস হবে। এছাড়া ঢাকা থেকে এলেঙ্গার পথে আরও পঁাচটি আন্ডারপাস নিমার্ণ হচ্ছে বলে জানান তিনি।



