লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্দি বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি
নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ >>>>
পানির অব্যাহত চাপের কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। চরম দুর্ভোগে দিশেহারা হয়ে পড়েছে বানভাসি মানুষ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এসব বানভাসি মানুষ ত্রাণের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে। শিশুদের অবস্থা করুণ। আসবাবপত্র ও গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়ছে বানভাসি মানুষ। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে বিধ্বংস্ত রাস্তাঘাট।
কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি কিছুটা কমলেও ব্র্রহ্মপুত্রের পানি এখনো বিপৎসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার ও ধরলার পানি বিপৎসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে রৌমারী উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। উপজেলার ৯০ গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি জীবন-যাপন করছেন। বানভাসি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে গবাদি পশুসহ পাকা সড়ক, উঁচু বাঁধ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন।
নওগাঁর আত্রাইয়ে উজান থেকে নেমে আসা পানি ও গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণের ফলে উপজেলার ছোট যমুনা নদীর পানি বেড়ে বিপথসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে উপজেলার মালিপকুর নামক স্থানে আত্রাই-সিংড়া সড়ক, পাঁচুপুর বেড়িঁবাধ ও পাঁচুপুর-সিংড়া রোড ভেঙ্গে আত্রাই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। সেই সাথে উপজেলার অর্ধশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। এর পরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করা হয়নি। শিক্ষকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হাঁটু পানি আবার কোথাও কোমর পানি ভেঙে গেলেও শিক্ষার্থী নেই। এদিকে দীর্ঘদিন যাবৎ ক্লাস করতে না পাড়লে এসব পরীক্ষার্থীরা সমাপনী পরীক্ষা ও বাষিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারবে না বলে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ।
অবিরাম বর্ষন ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী সবুরেনেছা কমিউনিটি ক্লিনিক ও ধানকুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। উপজেলার ৬ ইউনিয়নে ৫০ হেক্টর জমির নব্য রোপনকৃত রোপা আমন ধান ও বীজতলা তলিয়ে গেছে এবং হুমকির মুখে রয়েছে সহস্্রাধিক হেক্টর আমন জমি।
উজান থেকে নেমে আসা ঢলে জামালপুরের সরিষাবাড়ীর যমুনা, ঝিনাই ও সুবর্নখালী নদীর পানি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়ে উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটেছে। বৃহঃবার রাতে আওনা ইউনিয়নের স্থল এলাকায় তারাকান্দি-ভুয়াপুর সড়ক বাঁধটির স্থল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে ২০/২৫ মিটার তীব্র ¯্রােতে ভেঙ্গে পূর্ব পাশের প্রায় ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে গেছে। জামালপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি এলাকাবাসী গত চার দিন যাবৎ বালির বস্তা ও জিও ব্যাগ ফেলে রাস্তা ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও বৃহঃবার রাত দু’টোর সময় যমুনা নদীর পানির তীব্র স্রোতে ভেঙে যায়।
নওগাঁর পত্মীতলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বুধবার উপজেলার পাটিচরা ইউনিয়নের বুড়িদহ গ্রামের নিকট বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে ৭টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। বাঁধ ভেঙে ছুটে আসা পানির তোড়ে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন গ্রাম। পানির নীচে তলিয়ে গেছে প্রায় ৫হাজার হেক্টর জমির আমন ও বর্ষালি বোরো ধান।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে অব্যাহত পানি বৃদ্ধিতে বন্যার পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানাগেছে গতকাল বৃহস্পতিবার করতোয়া নদীর পানি কাটাখালী পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ৫৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে । পৌরসভার পশ্চিম অংশ সহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে বন্যার পানি প্রবেশ করে একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে।
বন্যার পানি বৃদ্ধিতে গতকাল বৃহস্পতিবার উপজেলা সাব-রেজিষ্টার অফিস চত্বর সহ পুরাতন গোবিন্দগঞ্জ বন্দর জলমগ্ন হয়ে পরেছে। উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানাগেছে, উপজেলার ৪১টি বিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং আগামী শনিবার থেকে এ উপজেলায় অনুষ্ঠিতব্য ষান্মাসিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। আর মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ১৯টি। মৎস্য অফিস সূত্রে জানাগেছে, উপজেলার ছোট বড় মিলে আড়াইশতাধিক পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। কৃষি অফিস জানায় ১২হাজার ৫৮৫ হেক্টর রোপা আমন ও ২হাজার ৪৫ হেক্টর সবজিসহ বিভিন্ন ফসল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম জানান, বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে এবং গতকাল বৃহস্পতিবার ৪/৫ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। ১০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা মিলে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ১০হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরো জানান, এপর্যন্ত ৮৫ মেট্রিক টন চাল ও আড়াই লক্ষ টাকার শুকনো খাবার বাবদ সরকারি ত্রাণ সহায়তা পাওয়া গেছে।
এদিকে গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর মহাসড়কের গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার পশ্চিম চারমাথা থেকে গুমানীগঞ্জ ইউনিয়নের কাইয়াগঞ্জ তরফমনু, সাপমারা ইউনিয়নের তরফকামাল কামারপাড়া পর্যন্ত মহাড়কের উপর দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে ঝুকিপূর্ন এ মহাসড়কে উপজেলা প্রশাসন গত বুধবার থেকে ভারী যান চলাচলে নিষেদ্ধাজ্ঞা জারি করলেও গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় মহাসড়কের ঝুকিপূর্ণ ওই অংশ দিয়ে ভারী যান চলাচল করছে। এতে করে যেকোন সময় ঘটতে পারে অনাঙ্কাখিত দুর্ঘটনা।



