সাংবাদিক শিমুল হত্যাকান্ডের তিন মাসেও চার্জশিট দেয়নি পুলিশ

জিএস নিউজ ডেস্কজিএস নিউজ ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৯:৩০ এএম, ২৬ এপ্রিল ২০১৭

রাজীব নূর ও আমিনুল ইসলাম খান রানাঃ>>>>>

প্রায় তিন মাস পার হলেও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের সমকাল প্রতিনিধি আবদুল হাকিম শিমুল হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল করেনি পুলিশ। ঘটনার পরপরই কিছুদিন পুলিশের তৎপরতা থাকলেও এখন মামলার তদন্তে চলছে গড়িমসি ভাব। আর এ সুযোগে প্রধান অভিযুক্ত মেয়র হালিমুল হক মিরুসহ অন্যরা জামিন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। শিমুলের স্বজন, সাংবাদিক-সহযোদ্ধা ও শাহজাদপুরের সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, হয়তো মিরুকে বাঁচাতে পর্দার অন্তরালে কেউ কলকাঠি নাড়ছে। তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনার পর পাওয়া বিভিন্ন আলামত যাচাই-বাছাই করতে একটু সময় লাগছে। যদিও শিমুল হত্যার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ বলেছিল, দ্রুত সময়ে চার্জশিট দেওয়া হবে। হত্যাকাণ্ডের ৮৩ দিন পরও চার্জশিট দাখিলের মতো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

চার্জশিট দাখিলে দীর্ঘসূত্রতার ব্যাপারে পুলিশের এ যুক্তি মানতে নারাজ শিমুলের স্বজনসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এরই মধ্যে ব্যালিস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে শিমুলের মাথায় পাওয়া গুলির লেডবলের সঙ্গে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত মেয়র হালিমুল হক মিরুর শটগানে ব্যবহৃত লেডবলের সাদৃশ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরে মিরুর ভাই হাবিবুল হক মিন্টুর দেওয়া তথ্যানুযায়ী উদ্ধার করা পাইপগানটিও যে সেদিনের ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে, তা-ও নিশ্চিত হওয়া গেছে। স্বজনের দাবি, দেশব্যাপী চাঞ্চল্য তৈরি করা শিমুল হত্যা মামলায় চার্জশিট দ্রুত দাখিল করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অজ্ঞাত কারণে মিরুকে মেয়রের পদ থেকে এখনও সাসপেন্ড করা হয়নি।

উদ্ধার হওয়া ওই অবৈধ অস্ত্রটির জন্য দায়ের করা মামলায় শুধুই মিন্টুকে আসামি করা হয়েছে। শিমুল হত্যা মামলার আইনজীবী আবুল কাশেম মিঞার দাবি, অবৈধ অস্ত্র রাখার এ মামলায়ও মিরুকে বাঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে মিন্টুর দেখানো মতে, শাহজাদপুরের মনিরামপুরে মিরুর কেনা বাড়ির দক্ষিণ পাশের ডোবা থেকে অস্ত্রটি উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু এ-সংক্রান্ত মামলায় বলা হয়েছে, এটি মিন্টুর বাড়ি। প্রকৃতপক্ষে অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে মিরু, মিরুর স্ত্রী লুৎফুন্নেসা পিয়ারী ও মিরুর আরেক ভাই হাসিবুল হক পিন্টুকেও আসামি করা উচিত ছিল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সমকালকে বলেন, সাংবাদিক শিমুল হত্যা মামলায় তদন্ত যাতে সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়, সে ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বদ্ধপরিকর। অপরাধী যে-ই হোক, অন্যায় করলে তার ছাড় নেই। শুরু থেকেই সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।

সমকালের অনুসন্ধান এবং শিমুল হত্যাকাণ্ডে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিও ফুটেজ দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে_ মিন্টুর হাতে যে অস্ত্রটি ছিল, তা উদ্ধার হওয়া পাইপগান থেকে ভিন্ন। এ থেকে প্রমাণ হয়, মিরু ও তার পরিবারের সদস্যদের কাছে আরও অবৈধ অস্ত্র রয়েছে, যেগুলো পুলিশ এখনও দিতে পারেনি। মিরুর বৈধ শটগানের জন্য কেনা ১১০টি বুলেটের মধ্যে পাওয়া গেছে ৪৩টি। বাকি ৬৭টি বুলেট কোথায় ব্যবহৃত হয়েছে, তা জানাতে পারেননি মিরু। সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, মেয়র মিরু বুলেটের হিসাব ঠিকমতো দিতে না পারায় তার গানটির লাইসেন্স বাতিলের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর সুপারিশ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন নাহার সিদ্দীকা বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ প্রশাসন থেকে চিঠি পাওয়ার পর মিরুর শটগানটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কোনো মামলা করা হয়নি কেন_ জানতে চাইলে তিনি বলেন, লাইসেন্স বাতিলের পর এর প্রতিবেদন গত ৬ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপার কার্যালয়ের শাহজাদপুর উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদারকি কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ বলেন, মিন্টুর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী পুলিশ মেয়র মিরুর বাড়ির পাশের ডোবা থেকে তার পাইপগানটি উদ্ধার করা হয়। যদিও মিন্টুর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়েছে, পরে আবার মিন্টুই আদালতের কাছে এ অস্ত্রটি তার বলে স্বীকার করেননি। তার পরও সেই অস্ত্রের কারণে মিন্টুই আরেকটি মামলায় একক আসামি হন। যেহেতু মেয়রের বাড়ি থেকে এটি উদ্ধার হয়নি, তাই মেয়র, তার স্ত্রী ও ছোট ভাই পিন্টু আসামি হননি। তা ছাড়া শিমুল হত্যাকাণ্ডের সময় পিন্টু পুলিশের কাছে আটক ছিলেন।

মেয়র মিরুর সহোদর এই পিন্টু এরই মধ্যে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়ে জেলার মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালত (সিজেএম) থেকে গত ৯ এপ্রিল জামিন পেয়ে বেরিয়ে এসেছেন।

গত ২ ফেব্রুয়ারি শাহজাদপুর পৌর শহরে উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা বিজয় মাহমুদকে মারধর ও আটকে রাখার ঘটনায় আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতাকর্মীর সঙ্গে মেয়র মিরুর সহোদর মিন্টু ও পিন্টুর সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে পেশাগত দায়িত্ব পালন, খবর সংগ্রহ ও ছবি তুলতে গিয়ে মেয়রের ছোড়া শটগানের গুলিতে গুরুতর আহত হন সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আবদুুল হাকিম শিমুল। পরদিন মারা যান তিনি। শিমুল হত্যাণ্ডের ঘটনায় তার স্ত্রী নূরুন্নাহার বেগমের দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত হন মেয়র মিরু ও তার ভাই মিন্টুসহ ১৮ জ্ঞাত ও অজ্ঞাত ২২ জন মিলে প্রায় ৪০ জন। অন্যদিকে, ছাত্রলীগ নেতা বিজয়ের চাচা এরশাদ আলীর দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত হন মিরু, মিন্টু, পিন্টুসহ ২৫ জন। সাংবাদিক শিমুল গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে শাহজাদপুর উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা বিজয় মাহমুদকে অপহরণ ও মেয়রের বাড়িতে আটকে মারধরের মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন পিন্টু। সাংবাদিক শিমুল হত্যাকাণ্ডে মিরু, মিন্টুসহ ১৩ জন বর্তমানে জেলা কারাগারে রয়েছেন।

শিমুল হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে কালক্ষেপণের সুযোগ নিয়ে মিরু ও মিন্টুর জামিনের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে। এর পেছনে সরকারদলীয় কিছু নেতা রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পিন্টুর জামিন পাওয়ার পর মিরু ও মিন্টুর জামিনও সময়ের ব্যাপার মাত্র_ এমন প্রচারণা চালাচ্ছেন মিরুর অনুসারীরা। শিমুল হত্যা মামলার আসামিদেরও এলাকায় প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে নতুন করে শঙ্কায় পড়েছেন শিমুলের স্ত্রী, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা। কারাগারে বসে মিরু ও মিন্টু তাদের ভাই পিন্টুর মাধ্যমে শিমুলের স্বজনদের হুমকি দিচ্ছেন_ এমন অভিযোগ তাদের। শিমুলের স্বজনদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে কি-না এমন প্রশ্নে পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, হুমকি-ধমকি দিয়ে থাকলে তা পুলিশকে কেউ জানায়নি।

শুধু হুমকি-ধমকি নয়, দ্বিধাবিভক্ত সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের একাংশ মিরু ও মিন্টুর জামিনপ্রাপ্তির চেষ্টায় প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অবশ্য প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ নেতাদের সবাই এখনও শিমুল হত্যার বিচার চাইছেন। জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, সিরাজগঞ্জ-২ (সদর ও কামারখন্দ) আসনের সংসদ সদস্য ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্না সম্প্রতি শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় উপস্থিত হয়ে সাংবাদিক শিমুল হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেছিলেন, মিরুর কারণে শাহজাদপুরে দল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমকালের প্রশ্নের উত্তরে গত রোববার জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুুল লতিফ বিশ্বাস বলেন, মিরুকে কেন্দ্র থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। সাংবাদিক শিমুল হত্যাকাণ্ডের শাস্তি হোক_ সেটি আমরাও চাই। দল কখনও অভিযুক্তদের জন্য দায় নেবে না।

শাহজাদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি বিমল কুমার কুণ্ডু ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুজ্জামান শফি বলেন, ‘আমরা রাজনীতির এত মারপ্যাঁচ বুঝতে চাই না। আমাদের সাংবাদিক সহযোদ্ধা শিমুল পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে খুন হয়েছেন। শিমুলের প্রতি মেয়র মিরুর বিদ্বেষের ঘটনা পুরনো। কাজেই শিমুলকে যদি টার্গেট করে গুলি করা হয়ে থাকে, বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই এবং শিমুলের মাথায় পাওয়া গুলির লেডবলের সঙ্গে মিরুর শটগানে ব্যবহৃত লেডবলের সাদৃশ্য থেকে এটা এখন প্রমাণিত।’ শুধু এই দুই সাংবাদিক নেতাই নন, শাহজাদপুর প্রেস ক্লাবের সব সদস্য এবং শিমুলের স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের দাবি, অবিলম্বে শিমুল হত্যা মামলার চার্জশিট দেওয়া হোক এবং মামলাটি দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করা হোক। মেয়রের পদ থেকে বরখাস্ত করা হোক মিরুকে।

শিমুল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে। মেয়র মিরুর অস্ত্রের পর তার ভাই মিন্টুর অস্ত্রটির ব্যালিস্টিক প্রতিবেদনও পুলিশের কাছে এসেছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে চার্জশিট দেওয়া হবে। শাহজাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খাজা মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে তদন্ত করায় একটু সময় লাগছে। বেশ কয়েকজন আসামি এখনও পলাতক। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। মে মাসের মধ্যে চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

আপনার মতামত লিখুন :