অর্ধযুগ পর বাজবে দোস্ত টেক্সটাইল মিলসের সাইরেন
নুরউল্ল্যাহ কায়ছার, ফেনী থেকেঃ>>>>
ফেনীর নতুন রানীরহাট ও কাজীরবাগ এলাকা এক সময় ছিল শহরের সবচেয়ে কর্মব্যস্ত এলাকা। আর এ কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রে ছিল শতবর্ষী দোস্ত টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। এর সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিক ও তাদের পরিবার-পরিজনকে নিয়ে মুখর ছিল পুরো এলাকা। এক সময়ে এলাকাবাসীর দিন শুরু হতো কারখানাটির সাইরেনের আওয়াজ শুনে। কিন্তু ছয় বছর ধরে নীরব রয়েছে দোস্ত টেক্সটাইল মিলসের সাইরেন। তবে আশার কথা হলো, সরকারের উদ্যোগে আবার উত্পাদনে ফিরতে চলেছে কারখানাটি। নিজেদের জীবিকার উেসর পুনরায় কর্মযজ্ঞে ফেরার খবরে স্বস্তি নেমে এসেছে মিলটির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের মধ্যে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ফেনীর দোস্ত টেক্সটাইল মিলসসহ দেশের ছয়টি মিলকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে আবার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে কারখানাগুলোকে পুনরায় সচল করার বিষয়ে দেশী-বিদেশী প্রায় ১৪টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এর মধ্যে আধুনিকায়নের মাধ্যমে ফেনীর দোস্ত টেক্সটাইল মিলসকে সচল করতে ব্যয় হবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।
জানা গেছে, সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আধুনিকায়ন-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বিটিএমসি। এছাড়া জানুয়ারিতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সরকার ক্রমান্বয়ে এসব উত্পাদনমুখী প্রতিষ্ঠানকে স্বায়ত্তশাসিত থেকে সরকারি খাতে নিয়ে আসার চিন্তা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
১৯০৩ সালে ফেনীর কাজীরবাগ বাজার ও রানীরহাট এলাকার মাঝামাঝি স্থানে ১১ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় দোস্ত টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। ১৯৬৫ সালে মিলটি সম্প্রসারণ করা হয়। এর মাধ্যমে প্রায় ২৩ একর জায়গাজুড়ে বড় পরিসরে উত্পাদনে যায় মিলটি। সে সময়ে এখানে এক থেকে দেড় হাজার শ্রমিক কাজ করত। শিফটিং ডিউটির কারণে শ্রমিকদের প্রায় সবাই কারখানার আশপাশের এলাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করত। ধীরে ধীরে মিলটির আশপাশে গড়ে ওঠে অসংখ্য দোকানপাট। তৈরি হয় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান।
কিন্তু বর্তমানে মিল এলাকার দৃশ্যপট ভিন্ন। বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে ফেনী জেলা শ্রমিক ঐক্যপরিষদের সহসভাপতি ও দোস্ত টেক্সটাইল মিলসের সিবিএ সাধারণ সম্পাদক মীর মো. ইদ্রিস জানান, সন্ধ্যার পরপরই এলাকাটি ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়। এখন আর কেউ এখানে আসে না। সাইরেনের আওয়াজও আর শোনা যায় না।
জানা গেছে, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো লোকসানে পড়তে শুরু করলেও দোস্ত টেক্সটাইল মিলসটি ছিল লাভজনক। তবে ২০০০ সালের পর এটিও ধীরে ধীরে লোকসানের মুখে পড়তে শুরু করে। এর পর বিভিন্ন মেয়াদে ঠিকাদারি চুক্তির ভিত্তিতে মিলটি চালানো হয়। তবে লোকসান শুরু হলে ২০০৬ ও ২০০৮ সালে দুই দফায় মিলটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০১১ সালে চুক্তি ভিত্তিতে স্বল্প পরিসরে মিলটি চালু হলেও অল্প কিছুদিন পরই কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৬ সালের পর কারখানাটির উত্পাদন কার্যক্রম অনিয়মিত হয়ে পড়ায় একটি অসাধু চক্র এর সম্পদ লুটে খাওয়ার পাঁয়তারা শুরু করে। ওই মহলের যোগসাজশে কর্তৃপক্ষ মিলের ১২ দশমিক ৭১ একর জমি তিন ভাগে বিভক্ত করে বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করে। তত্কালীন সময়ে এ সম্পত্তির মূল্য ৭০ কোটি টাকার বেশি ছিল। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্রাদার্স ফ্লাওয়ার্স মিলস লিমিটেড, গ্রেট স্টোন লিমিটেড ও মীর অ্যান্ড কোং নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। প্রক্রিয়া শেষে অন্তত ৭০ কোটি টাকার সম্পত্তি মাত্র ২ কোটি ৭১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৮ টাকায় বিক্রি করে দেয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। একপর্যায়ে বিটিএমসি দরপত্র বাতিল করে। এর পর দরপত্রদাতারা ২০০৭ সালে হাইকোর্টে মামলা করলে আদালতের রায় তাদের পক্ষে যায়। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কর্মচারীরা আপিল করলে ২০১৩ সালে দরপত্রটি বাতিলের আদেশ দেন আদালত। ২০১৪ সালের ৩০ জুন মিলটি পরিদর্শনের পর এটি পুনরায় চালুর ব্যাপারে শ্রমিক-কর্মচারীদের আশ্বাস দেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম।
দোস্ত টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও মিলিং ইনচার্জ মো. জসিম উদ্দিন জিএস নিউজকে জানান, এটি পুনরায় চালুর ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো নথিপত্র এখানে আসেনি। মিলটি ফের চালু হলে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান তৈরি হবে।



