পাহাড়ের অবৈধ বসতি থেকে মানুষ কেন সরে না ??

GS News 24GS News 24
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৪:১৫ পিএম, ২১ এপ্রিল ২০১৮

স্টাফ রিপোর্টারঃ>>>

২০০৭ সালে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ১২৭ জনের প্রাণহানির পর ৩৬টি সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। কিন্তু গত ১১ বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ ওই দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন সময় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। তাই পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের কম খরচে আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রথম থেকেই উঠে এসেছে। এরপরও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। প্রশ্ন হলো, পাহাড়ের অবৈধ বসতি থেকে মানুষ কেন সরে না? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর কারণটা আর্থ–সামাজিক। এজন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, সেই নীতিমালা বাস্তবায়নে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে আসা উচিত।

সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া এক মন্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, এর পুরো কারণটিই আর্থ–সামাজিক। ২০০৭ সালে ট্রাজেডির পর সরকারের উচ্চ পর্যায়ে গঠিত কারিগরি কমিটির এ সদস্য আরো বলেন, ছিন্নমূল এসব মানুষের কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় তারা কম খরচে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় বসবাস করছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানীয় এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই অবৈধভাবে এসব ঘর তৈরি করছেন। যেহেতু এটার সাথে একটি গভীর আর্থ–সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জড়িত, সেজন্য চাইলেও তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। অধ্যাপক ইসলাম বলেন, বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটলেই নীতি নির্ধারণ পর্যায়ে নড়াচড়া হয়। কিন্তু পরে অনেক ক্ষেত্রেই তা স্তিমিত হয়ে যায়।

২০০৭ সালে পাহাড় ধসে ১২৭ জনের মৃত্যুর পর এ নিয়ে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এর পরের বছরগুলোতে পাহাড় ধস হয়েছে। তবে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল কম। ফলে বিষয়টিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে সবার সদিচ্ছা আছে জানিয়ে সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের স্থায়ী সমাধান নিয়ে সবারই সদিচ্ছা আছে। কিন্তু সদিচ্ছা থাকলেও আমাদের উদ্যোগের অভাব আছে। উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীতে কোনো সময় তা ভুলে যায় বা সেখান থেকে দূরে সরে যাওয়া হয়। একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

অনুপম সেন বলেন, এভাবে চলতে পারে না। এটা নিয়ে স্থায়ী সমাধানের দিকে যাওয়া উচিত। প্রতি বছরই বর্ষা এলে পাহাড় থেকে ছিন্নমূলদের উচ্ছেদ কার্যক্রম চলে। এ সময় মানবিক আবেদন তৈরির পাশাপাশি অপ্রীতিকর অনেক ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কিছু করার নেই। তাদের জীবন বাঁচাতেই পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সরিয়ে আনতে হবে।

তিনি বলেন, সাধারণত পাহাড়ের পাদদেশে যারা বসবাস করছেন, তারা ভাড়া দিয়েই থাকছেন। এজন্য তাদের আবাসন নিশ্চিতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কম খরচে তাদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুস্থদের আবাসন নিশ্চিতের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। এর মধ্যে গৃহায়ণ প্রকল্প, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প। পাহাড়ে পাদদেশে বসবাসকারীদের জন্য এ ধরনের একটি আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে কোথায় কোথায় আবাসন প্রকল্প করা যায়, সেটা চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরতে হবে। চট্টগ্রামে সিডিএ, সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রফেসর সেন আরো বলেন, যারা সাধারণত পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে তারা ছিন্নমূল ও অসহায়। জীবিকার তাগিদে কম খরচে ওইসব ঘরে বসবাস করছেন। আবার তাদেরকে নিয়ে একটি পক্ষ ব্যবসা করছে। সরকারি পাহাড়সহ অন্য পাহাড়গুলোতে মাস্তানি বা প্রভাব খাটিয়ে প্রথমে তারা নিজেরা টাকা খরচ করে ঘর বানিয়ে থাকছে। পরে ওইসব ঘরে ছিন্নমূল মানুষদের নিয়ে আসা হয়।

তবে পাহাড় ধসে মৃত্যু ঠেকাতে প্রশাসনিকভাবে উদ্যোগ যে একেবারে বিফল হয়েছে তা বলা যাচ্ছে না। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের আগেই পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেসবের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন সময় পাহাড়ে বসতি উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সর্বশেষ গত বুধবার বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে বৈঠকে পাহাড় ধসে যাতে প্রাণহানি না ঘটে, সেজন্য ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো চিহ্নিত করে বসতি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়। বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

সাধারণত পাহাড় রক্ষা এবং ঝুঁকিতে থাকা এসব মানুষের বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে বর্তমান কমিটি কাজ করছে ত্রাণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন বলেন, স্থায়ী সমাধানে যাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আর এটা উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত।

পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসন করা সম্ভব নয়। জেলা প্রশাসন পাহাড়ে বসবাসকারীদের ঝুঁকি এড়াতে শুধুমাত্র মোবাইল কোর্ট পরিচালিত করে থাকে।

আগামীকাল ২২ এপ্রিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা চট্টগ্রামে আসছেন। ওই দিন পাহাড়ে বসতি কার্যক্রম নিয়ে র‌্যালির পাশাপাশি আলোচনায় বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা জানতে পারবেন বলে জানান জেলা প্রশাসক।

২০০৭ সালের কমিটির সুপারিশের মধ্যে উল্লেযোগ্য কয়েকটি হলো, পাহাড় দখলমুক্ত করে বনায়ন, ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের স্থায়ী পুনর্বাসন, পাহাড় কাটা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং পাহাড় ইজারা ও দখল বন্ধ করা। এছাড়া সুপারিশের মধ্যে পুনর্বাসন ছাড়াও রয়েছে পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, মামলা দায়ের নীতিমালা প্রণয়ন, নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণ, বালি উত্তোলন নিষিদ্ধ, পাহাড়ের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা তৈরির অনুমোদন না দেওয়া, ৫ কিলোমিটারের মধ্যে হাউজিং প্রকল্প না করা। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না করেই বারবার অস্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গত কয়েক বছরে জেলা প্রশাসনের কার্যক্রমের মধ্যে দেখা গেছে, বর্ষাকালে ২/৩ মাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিয়ে সরকারি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাইক্লোন সেন্টারে রাখা হয়। কোনো কোনো সময় খোলা মাঠে তাঁবু টাঙিয়ে রাখা হয়। তবে বর্ষা শেষে ওইসব পরিবার পুনরায় আগের জায়গায় ফিরে যায়।

নগরীতে ২০০৭ সালের ১১ জুলাই শিশু, নারীসহ ১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। পরের বছর লালখান বাজার এলাকায় পাহাড় ধসে ১১ জনের মৃত্যু হয়। ২০০৯ ও ২০১০ সালে মারা যান ১৫ জন। ২০১১ সালের জুলাই মাসে টাইগারপাস এলাকায় পাহাড় ধসে ১৭ জনের মুত্যু হয়। একই বছর আগস্টে বিশ্বব্যাংক কলোনিতে ২ জনের মৃত্যু হয়। ২০১২ সালে ২৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালে মারা যান ৫ জন। ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বায়েজিদ থানাধীন আমিন কলোনিতে পাহাড় ধসে তিনজনের মৃত্যু হয়। এর দুই মাস পর ২১ সেপ্টেম্বর একই থানাধীন মাঝিরঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে মা–মেয়ের মৃত্যু ঘটে। ২০১৫ সালের ১৯ জুলাই মারা যায় ৫ শিশুসহ ৬ জন। সর্বশেষ ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে মারা যান আরো ১৭ জন।

জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় আছে। সরকারি–বেসরকারি মালিকানাধীন এসব পাহাড়ের মধ্যে রেলওয়ের মালিকানাধীন মতিঝর্ণা ও বাটালি হিলে ৩২০টি পরিবার বসবাস করছে। এভাবে বিভিন্ন পাহাড়ে মোট ৬৬৬টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে বলে জানানো হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। তবে জেলা প্রশাসনের তৈরি করা তালিকাটি কয়েক বছর আগের। এর মধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :