হজ্ব ক্যাম্পে কান্নার রোল
স্টাফ রিপোর্টার:>>>
এজেন্সিকে সব টাকা পরিশোধের পরও এখনো কয়েক হাজার লোকের হজে যাওয়া নিশ্চিত নয়। ভিসা হওয়ার পরও বিমানের টিকিট নেই। বিমানের টিকিট নিতে পারলেও শিডিউলের নিশ্চয়তা নেই। আজ বিমানের শেষ হজ ফ্লাইট, কাল সৌদি এয়ার লাইন্সের। হজে যেতে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে এসে এখন হজ ক্যাম্পে বসে অপেক্ষা। অনেক হজযাত্রী কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
তাদের একটাই কথা, এবার হজে যেতে পারবেন তো। : দেশে ফ্লাইট বাতিলসহ নানা বিড়ম্বনায় সৌদি আরবে গিয়েও হজ এজেন্সিগুলোর অব্যবস্থাপনা ও নানা ধরনের দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশি হজযাত্রীরা। নিম্নমানের খাবার, দেরিতে বাড়িভাড়া করা, চুক্তিহীন বাড়িতে গাদাগাদি করে হজযাত্রীদের রাখা, দেরিতে মোয়াল্লেম নেয়া, হজযাত্রীদের খোঁজখবর না নেয়া, নিম্নমানের লাগেজ সরবরাহসহ অনেক অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশি এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে। স¤পূর্ণ টাকা হজের এজেন্সিকে দেয়ার পরও অনেক হজযাত্রী এ বছর হজে যেতে পারছেন না। আবার হজে যাওয়ার পরও সৌদিতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়ছেন।
যাদের বিমানের টিকিট কাটা বাকি রয়েছে, তাদের হজে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভিসা হওয়ার পরও টিকিট কাটা হয়নি অনেকের। দিনের পর দিন ঘুরেও হজে যেতে না পারায় কান্নার রোল পড়েছে হজ ক্যাম্পে। আজ শনিবার বিমানের শিডিউল মোতাবেক শেষ হজ ফ্লাইট। ভিসা পাওয়ার পরও এখনো ১৬ হাজারের মতো হজযাত্রী মক্কায় যেতে পারেননি। হজ অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ৫৫২ জন লোক হজে যেতে ভিসা পেয়েছেন।
শুক্রবার পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১২ হাজার ২৩৬ জন মক্কায় পৌঁছেছেন। আজ ২৬ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমান এবং ২৭ আগস্ট পর্যন্ত সৌদি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট রয়েছে। এ দু-তিন দিন বাকি হজযাত্রী পরিবহন করতে হিমশিম খাচ্ছে দুটি এয়ারলাইন্স। জানা যায়, এখনো প্রায় ১৫ হাজারের মতো হজযাত্রী ঢাকায় অপেক্ষমাণ। এরই মধ্যে বিমানের ফ্লাইট শেষ হয়ে যাওয়ার ঘোষণায় উদ্বিগ্ন হাজিরা। তবে বিমানের পক্ষ থেকে আরো দুই দিন হজ ফ্লাইট বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ধর্ম ও বিমান মন্ত্রণালয়ের চরম অব্যবস্থাপনা এবং এজেন্সিগুলোর প্রতারণায় হজযাত্রীরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে হজ ক্যাম্পের বারান্দায় দিন কাটাচ্ছেন। এদিকে ভিসা হওয়ার পরও এখনো অনেক হজযাত্রীর টিকিট কাটেনি হজ এজেন্সিগুলো। হজ অফিস থেকে সব এজেন্সিকে ভিসাপ্রাপ্ত সব হজযাত্রীকে টিকিট নিশ্চিত করে জরুরি ভিত্তিতে সৌদি আরব পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে হজ অফিস। কিন্তু হজ অফিসের এ আহ্বানে অনেক এজেন্সিই সাড়া দেয়নি। এদিকে ভিসা হওয়ার পরও টিকিট না কাটায় দিনের পর দিন ঘুরেও হজে যেতে না পারায় কান্নার রোল পড়েছে হজ ক্যাম্পে। চুক্তি অনুযায়ী সব টাকা পরিশোধের পরও তাদের ঘুরতে হচ্ছে এজেন্সি ও দালালদের দ্বারে দ্বারে।
জমি বিক্রি করে জীবনের শেষ ইচ্ছা স্ত্রীকে নিয়ে পবিত্র হজ করতে চেয়েছিলেন পাবনার আবদুস সালাম। শেষ মুহূর্তে এজেন্সি অতিরিক্ত টাকা দাবি করছে। কিন্তু তা পরিশোধ করতে না পারায় তাকে টিকিট দেয়া হয়নি। মিস ফালাহ ট্রাভেলস থেকে নিবন্ধন করা এ হজযাত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এজেন্সির দালাল আবু হানিফকে বারবার ফোন দিলেও রিসিভ করছে না।
সাতক্ষীরার বয়োবৃদ্ধ হায়দার আলী বলেন, ২০১৫ সালে টাকা পরিশোধ করে দুই বছর পর ভিসা পান। টিকিটের অপেক্ষায় এক সপ্তাহ ধরে হজ ক্যাম্পে রয়েছেন। কিন্তু তার হাতে এখনো বিমানের টিকিট দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, এজেন্সি আরো ৫০ হাজার টাকা দাবি করছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এত টাকা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না জানালে এজেন্সি তাকে টিকিট দিচ্ছে না। এভাবে অনেক হজযাত্রীরই টিকিট না পাওয়ায় হজে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। হজ অফিসে বারবার যোগাযোগ করেও তাদের কোনো সুরাহা হচ্ছে না। কিছু এজেন্সির অনিয়মের কথা স্বীকার করে হজ পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ভিসাপ্রাপ্ত সবাইকে হজে পাঠাতে যাতে কোনো গড়িমসি না হয় সে জন্য বারবার তাগাদা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে অনেকে টিকিট কেটেছেন। অনেকে কিছু হজযাত্রী সৌদি আরবেও পাঠিয়েছেন বলে হজ পরিচালক জানান। : বেসরকারি হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন এর সচিব শাহাদাত হোসাইন তসলিম বলেন, দালাল এবং ব্যাংকের নানা হয়রানির কারণে সঠিক সময় টিকিট পাচ্ছেন না হজযাত্রীরা। তবে গত দুই দিনে অনেক এজেন্সিই টিকিট করে হজযাত্রীদের সৌদি আরবে পাঠিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সৌদি যাওয়ার পরও জেদ্দা বিমানবন্দরে হজযাত্রীদের সাত ঘন্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পাঁচ ঘন্টা ও মক্কার উদ্দেশে বাসে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট প্লাজাতে এক থেকে দুই ঘন্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জেদ্দায় নিয়োগপ্রাপ্ত মৌসুমি হজ অফিসার মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেইন গত বুধবার ধর্ম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশ থেকে আগত হজযাত্রীদের জেদ্দা হজ টার্মিনালের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবগত হয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে আসার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন। চিঠিতে তিনি জানান, জেদ্দা কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হজ টার্মিনালে এখন হজযাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। সারা পৃথিবী থেকে হজযাত্রী নিয়ে একের পর এক ফ্লাইট অবতরণ করছে। নির্দিষ্টসংখ্যক ইমিগ্রেশন পয়েন্ট দিয়ে অসংখ্য হজযাত্রীর ইমিগ্রেশন করতে হচ্ছে।
ফলে হজযাত্রীদের ফ্লাইট থেকে অবতরণ করার পর ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শুরু করতে গড়ে পাঁচ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ইমিগ্রেশন লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে আরো এক ঘন্টা। তিনি আরো জানান, ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার পর মক্কার উদ্দেশে বাসে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট প্লাজায় আরো এক-দুই ঘন্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে জেদ্দা এয়ারপোর্টে প্রায় ৬-৭ ঘন্টা হজযাত্রীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় হজযাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষার প্রয়োজনীয় মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আসার অনুরোধ জানান তিনি। : মৌসুমি হজ অফিসার বলেন, জেদ্দা বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার আগে টাকা থাকলেও কিছু কিনে খাওয়ার সুযোগ নেই। তাই হজযাত্রীরা আসার সময় শুকনো খাবার যেমন বিস্কুট, চিঁড়া ও মুড়ি সাথে নিয়ে আসতে পারেন। হ্যান্ডব্যাগে প্রয়োজনীয় ওষুধ রাখারও পরামর্শও দেন তিনি



