বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে সাফল্য অর্জন করতে চান ড. কামাল
স্টাফ রিপোর্টারঃ>>>
জনগণের ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে সব রাজনৈতিক দাবি আদায় করেছিলেন, সেটিকে পাথেয় হিসেবে নিয়ে আন্দোলনে সফল হতে চান নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন।
১৩ অক্টোবর, শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তৃতীয় তলায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ড. কামাল এ সব কথা জানান।
এর আগে সন্ধ্যা ৬টায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা জাতীয় প্রেসক্লাবের তৃতীয় তলার হলরুমে মিলিত হন। তাদের অভিন্ন ৭ দফা দাবি আর ১১টি লক্ষ্যের কথা জানিয়ে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন মাহমুদুর রহমান মান্না।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গণতন্ত্র ফেরাতে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করবে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া’, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ আরও বেশ কয়েকটি দল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও পেশাজীবীদের এতে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এই নতুন জোটের বাইরে থাকছে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে এই জোটের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। আয়োজক সূত্র থেকে জানা যায়, অসুস্থ থাকার কারণে তিনি এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি।
নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে ড. কামাল হোসেন তার বক্তব্যের শুরুতে একাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে পরিস্থিতি সাহসের সঙ্গে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মোকাবিলা করেছেন, তা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাকে কিছু না দিলেও একটি জিনিস শিখিয়েছেন; সেটি হচ্ছে কীভাবে জনগণের ওপর নির্ভর করে দাবি আদায় করতে হয়। তার শক্তি ছিল জনগণের শক্তি। বাংলার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে কেউ তাদের দাবিয়ে রাখতে পারেনি, আর পারবে ও না। এটা অতীতে বারবার প্রমাণিত হয়েছে। কেউ যদি বলে আপনাকে গুলি করব, করুক। আমি ভয় পাই না। বঙ্গবন্ধু শিখিয়েছেন একজন মুসলমান হিসেবে যখন মৃত্যু আসবে, তখনই মৃত্যু হবে। এর আগেও না, পরে হবে না।’
সরকারের উদ্দেশ্যে বর্ষীয়ান এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সংবিধানে স্পষ্ট লেখা আছে, এই দেশের মালিক জনগণ; গণতন্ত্র তাদের অধিকার। সুতরাং বৈধভাবে একটি সরকার গঠন করতে হলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। একজন ক্ষুদ্র আইনজীবী হিসেবে আমি সেটি বুঝি।’
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে সব দল-মত, পেশাজীবীদের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান ড. কামাল। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষরিত দলিলে বলা আছে, তিনি কোন বাংলাদেশ চেয়েছেন। সেই বাংলাদেশ গড়তে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।’
ড. কামাল আরও বলেন, ‘জনগণের ঐক্য হলে দুর্নীতিবাজরা পালিয়ে যাবে। তারা পালিয়ে যাক। আমাদের কিছু করার নেই। আমাদের যেন বাধা দেওয়া না হয়।’
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে নতুন স্বপ্নের সূচনা হলো জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এর মাধ্যমে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার নতুন সূচনা হলো। আমরা মুক্ত দেশ, মুক্ত মতপ্রকাশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। নতুন আঙ্গিকে এই লড়াই শুরু হলো। অনেকে এই ফ্রন্টের বাইরে রয়েছেন। তাদের কাছে আহ্বান, আসুন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের বাংলাদেশ গঠনে সম্পৃক্ত হই।’
ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা ও জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের চক্রান্ত মোকাবেলা করবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই দেশে কোনো দলীয় শাসন আর কায়েম হবে না। সরকার বলছে, ড. কামাল নাকি ষড়যন্ত্র করছে। কামালরা ষড়যন্ত্র করেন না, আমরা নির্বাচনে যেতে চাই। আমাদের দাবি মেনে নিয়ে নির্বাচন হলে তাতে আমরা অংশগ্রহণ করব।’
‘একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বৃহত্তর ঐক্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৭২ সালে দলীয় সরকার কায়েমের মধ্য দিয়ে সেই জাতীয় ঐক্য হত্যা করা হয়েছে। সুদীর্ঘ বছর পরে আজকে জাতি আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে ড. কামাল হোসেন ও বদরুদ্দেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে। অসুস্থতার জন্য বি চৌধুরী এখানে উপস্থিত হতে পারেনি; আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি।’
ওই সময় খালেদা জিয়ার কারাবন্দীর প্রসঙ্গ তুলে আবদুর রব বলেন, ‘তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আজ পঙ্গু হতে চলেছেন। জনগণ চায় তার মুক্তি।’
দেশ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দিকে তাকিয়ে আছে উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘দেশের এই সংকটকালীন সময়ে এই জোট আশার আলো হিসেবে কাজ করবে। যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হয়, তাহলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যে ৭ দফা দাবি দিয়েছে, সেগুলো পূরণ করতে হবে। এ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।’
নতুন এই জোট গঠনের দিনটিকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে এই জোট টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে থাকবে। স্বৈরাচারী সরকারকে হটাতে একমাত্র অস্ত্র এই জাতীয় ঐক্য।’
গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে আমি লন্ডন থেকে এ দেশে এসেছিলাম বিজয়ের পর শান্তি, জনকল্যাণের পথ, স্বপ্ন প্রতিষ্ঠায়। সেই প্রতিষ্ঠা হবে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে। দুঃখের বিষয়, অদ্যাবধি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি; বরং আমাদের বাকরুদ্ধ হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জনগণ পরিবর্তন চায়। প্রতিটি জায়গায়-মহল্লায়-রাস্তায় পরিবর্তন চায়। কিসের জন্য পরিবর্তন? কৃষক তার উৎপাদিত মূল্যের সঠিক মূল্যে পাবে। শ্রমিক এমন মজুরি পাবে, যাতে সে বেঁচে থাকতে পারবে। গরিবের চিকিৎসা, বাসস্থানের নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যেই আজকে আমাদের পদযাত্রা।’
‘স্বৈরশাসন, অপশাসনের বিরুদ্ধেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। আপনাদের সকলের সহযোগিতায় আগামী সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। যেখানে হিংসা-প্রতিহিংসা থাকবে না, অত্যাচার থাকবে না, বিনা কারনে গায়েবি কোন মামলা থাকবে না।



