মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ৬১% হিসাব নিষ্ক্রিয়
গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের হিসাব সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার। তবে এসব হিসাবের সবই যে সক্রিয়, তা নয়। তিন মাসে অন্তত একটি লেনদেন হয়েছে, এমন হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৮ লাখ ৭৪ হাজার। এ হিসাবে সক্রিয় হিসাবের হার প্রায় ৩৯ শতাংশ। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য খোলা বাকি ৬১ শতাংশ হিসাবই নিষ্ক্রিয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে ‘আইটি অপারেশন অব ব্যাংকস’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)। ওই প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। তিন মাসের মধ্যে একটি লেনদেনও হয়নি, এমন হিসাবকে নিষ্ক্রিয় ধরা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতি বছরই মোবাইল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে নিষ্ক্রিয় হিসাবের সংখ্যাও। ২০১৩ সালে মাত্র ৫০ শতাংশ হিসাব নিষ্ক্রিয় থাকলেও পরের বছর তা প্রায় ৫২ শতাংশে উন্নীত হয়। এছাড়া ২০১৫ সালে মোট হিসাবের ৫৫ শতাংশ নিষ্ক্রিয় ছিল। তবে গত বছর শেষে তা ৬১ দশমিক ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যতবারই নির্দেশনা বা সুপারিশমালা দিয়েছে, তার বিপরীতে এজেন্টরা নানা ধরনের ফাঁকফোকর বের করেছেন। সেবাটি চালুর সময় এজেন্টদের হিসাব খোলার ওপর বিশেষ সুবিধা দেয়ার কারণে এজেন্টরা নামে-বেনামে হিসাব খুলেছেন। শুরুতে একটি হিসাব খুললে এজেন্টদের ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে লেনদেন করেছেন তারা। সম্প্রতি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একটি হিসাব চালু রাখার বিধান করা হলেও এজেন্টরা তাদের পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের নামে হিসাব চালু করছেন, যেগুলোর সিংহভাগই নিষ্ক্রিয় থাকছে।
মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম ডাচ্-বাংলা। রকেট নামে এ সেবা দিচ্ছে ব্যাংকটি। জানতে চাইলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মো. শিরিন জিএস নিউজ২৪ কে বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক তৈরি বা হিসাব চালু অনেকটাই এজেন্টনির্ভর। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রণোদনা দিতে হচ্ছে। তবে এজেন্টরা হিসাব চালুর ক্ষেত্রে সুবিধার অপব্যবহার করছেন, যার বোঝা কিছুটা গিয়ে ব্যাংকের ওপর পড়ছে।
মোবাইল ব্যাংকিং সাধারণ মানুষের অর্থ লেনদেনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠছে জানিয়ে তিনি বলেন, সামনের দিনে তা আরো সম্প্রসারণ হবে। পরিস্থিতির উন্নয়নে একটি শক্তিশালী নীতিমালা প্রয়োজন।
গবেষণাটি পরিচালনায় ছিলেন বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক মো. শিহাব উদ্দিন খান, মো. মাহবুবুর রহমান আলম, সহকারী অধ্যাপক কানিজ রাব্বি ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের আইটি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ এমদাদুল হক খান।
মো. মাহবুবুর রহমান আলম বলেন, গবেষণাটি পরিচালনার সময় একজনের নামে ৭০০টি হিসাব চালুর তথ্যও পাওয়া গেছে। তার মোবাইলের সিম রাখার জন্য একটি বক্স রাখতে হয়। হিসাব নিষ্ক্রিয় হওয়ার এ ধরনের নানা তথ্য গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে মোবাইল ব্যাংকিং জাতীয় অর্থনীতির গতিশীলতার জন্য প্রয়োজন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সিংহভাগ ব্যবসায়ীই ক্ষুদ্র ও মাঝারি। পাশাপাশি গত কয়েক বছরে দেশের অভ্যন্তরেই মানুষের গতিশীলতা বেড়েছে। অন্যান্য পেশাজীবীরও ভ্রাম্যমাণ অর্থের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। সঠিক সময়ে তারা অর্থ পেলে তাদের কাজে গতিশীলতা আসতে বাধ্য। তবে ব্যাংকিংটি হতে হবে সঠিক ও কার্যকর নিয়মনীতি মেনে উপযুক্ত তদারকির মাধ্যমে।
তথ্যমতে, গত বছর শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ১০ হাজার। এসব এজেন্ট ১৪৭ কোটি ৩২টি লেনদেনের মাধ্যমে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা লেনদেন করেছেন।
বিআইবিএমের সুপার নিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, দেশের আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখছে মোবাইল ব্যাংকিং। তবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি কেওয়াইসি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি লেনদেনের ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা বা এর বেশি নগদ অর্থ জমা বা উত্তোলনে গ্রাহককে পরিচয়পত্র বা স্মার্টকার্ডের ফটোকপি প্রদর্শনসহ রেজিস্টারে গ্রাহকের স্বাক্ষর বা টিপসই সংরক্ষণের যে নির্দেশনা দিয়েছে, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সেবার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করার পর নতুন ধারার এ ব্যাংকিং শুরু হয়। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের হাত ধরে ২০১১ সালে দেশে যাত্রা হয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের। পরে মোবাইল ব্যাংকিং বাজারে আসে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’। ২০১২ সালে বেসরকারি খাতের ইউসিবি ‘ইউ-ক্যাশ’ ও ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আসে ‘এম-ক্যাশ’। ২০১৩ সালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের জন্য পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই বছরই মার্কেন্টাইল ব্যাংক ‘মাই-ক্যাশ’ ও ওয়ান ব্যাংক ‘ওকে ব্যাংক’ নামে সেবাটি চালু করে। একই বছর আইএফআইসি ব্যাংকও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, হিসাব নিষ্ক্রিয় হওয়ার বিষয়টি সাধারণ ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে ছয় মাস হলেও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে তা তিন মাস। এজন্য কিছু হিসাব নিষ্ক্রিয় হচ্ছে। তবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন বাড়ছে।
তাছাড়া লেনদেনের নতুন নতুন বিষয়ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে আরো গতিশীলতা আনতে নিয়মনীতির সঠিক বাস্তবায়ন তদারকি করা হচ্ছে।



