কথায় কথায় কলড্রপ। অতিষ্ঠ মোবাইল ফোন গ্রাহকরা

জিএস নিউজ ডেস্কজিএস নিউজ ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১০:৩৫ এএম, ১৪ অক্টোবর ২০১৭

স্টাফ রিপোর্টার:>>>

মোবাইল ফোনে কথা শুরু করেছেন, হুট করে লাইন কেটে গেল। কলড্রপ। আবার কল দিলেন, অপর প্রান্তে ধরা হলো, নেটওয়ার্ক অন, হ্যান্ডসেটের পর্দায় এয়ারটাইম মিনিট গতিশীল দেখাচ্ছে; কিন্তু কথা শুনছেন না। মিউট কল। কিছু পয়সা গচ্চা দিয়েই কল কেটে আবার নতুন কল করতে হচ্ছে। ড্রপ আর মিউটের যন্ত্রণায় মোবাইল ফোন গ্রাহকরা অতিষ্ঠ। থ্রিজি সেবায় মোবাইল ইন্টারনেটের গতি অস্বাভাবিক কম থাকায় হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার কিংব মেসেঞ্জার ব্যবহার করে কল করার ক্ষেত্রেও বারবার ‘নো কানেকশন’, ‘রিকানেকটিং’ কিংবা ‘ওয়েটিং ফর নেটওয়ার্ক’-এর যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে স্ট্মার্টফোন ব্যবহারকারীদেরও।

 

 

আন্তর্জাতিক টেলিকম ইউনিয়নের নির্ধারিত মান অনুযায়ী বেতার তরঙ্গনির্ভর মোবাইল নেটওয়ার্কে ৩ শতাংশ কলড্রপ গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটররাও দাবি করছেন, তাদের কলড্রপের হার ৩ শতাংশের নিচে এবং এক শতাংশের বেশি নয়। কিন্তু গ্রাহকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে অপারেটরদের এই দাবির অনেক বড় পার্থক্য।

 

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে কলড্রপ অনিবার্য একটি বিষয়। কারণ গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অনুপাতে অপারেটরদের নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং হালনাগাদ করা হয়নি। এর সঙ্গে বাংলাদেশের নেটওয়ার্কে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ বা আইসিএক্স রাখার কারণেও ওই এক্সচেঞ্জের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় কলড্রপ হচ্ছে। এক অপারেটরের কল অন্য
অপারেটরের নেটওয়ার্কে আনুপাতিক হারে বরাদ্দের কাজটি করে আইসিএক্স। পুরো দুনিয়াতেই এই আনুপাতিক বরাদ্দের কাজটি মোবাইল অপারেটররা নিজেরা করে। শুধু বাংলাদেশে এ জন্য পৃথক আইসিএক্স অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কলের জন্য গ্রাহককে যেমন বাড়তি পয়সা গুনতে হচ্ছে, তেমনি নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত একটা স্তরের জন্য সেবার গুণগত মানও খারাপ হচ্ছে।

 

 

সকাল ও সন্ধ্যা ব্যস্ত সময়। আবার মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় একই সময়ে লেনদেন বেড়ে যাওয়ার কারণেও নেটওয়ার্কের ওপর প্রবল চাপ পড়ছে। ফলে কলড্রপ হচ্ছে।

কলড্রপের এই অভিযোগ মোবাইল অপারেটররাও স্বীকার করে নিয়ে বলছেন, কম বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে অনেক বেশি সংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেওয়া হচ্ছে। ফলে কলড্রপ ঠেকানো সত্যিই বড় চ্যালেঞ্জ।
কারণ অনেক :বাংলাদেশে কলড্রপ কেন হচ্ছে জানতে চাইলে প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র ফেলো আবু সাঈদ খান সমকালকে বলেন, নেটওয়ার্কে কলড্রপ অনেক কারণে হয়। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে বড় কারণ- যে হারে মোবাইল গ্রাহক বেড়েছে, সে হারে নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, হালনাগাদ বা সম্প্রসারণ না হওয়া। অধিক গ্রাহকের চাপ নেটওয়ার্ক নিতে পারছে না।

তিনি বলেন, মোবাইল নেটওয়ার্কে গ্রাহকের জন্য মানসম্পম্ন সেবা নিশ্চিত হচ্ছে কি-না তা দেখার দায়িত্ব টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির। বিটিআরসি সেবার গুণগত মানের একটা ‘মানদন্ড’ নির্ধারণ করতে পারে এবং সেই মানদন্ড কতটা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে, সেটা বিচার করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে বিটিআরসি সে দায়িত্বটা পালন করছে না।

 

 

মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব টি আই এম নুরুল কবীর সমকালকে বলেন, বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরদের অনেকগুলো সেবাদাতার ওপর নির্ভর করতে হয়, যেমন, ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) ও ট্রান্সমিশন কোম্পানি (এনটিটিএন)। ফলে এদের যে কোনো একটির সমস্যার কারণেও কলড্রপ হতে পারে। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় নেটওয়ার্কের বিপুল ব্যবহার, ফলত বিপুল চাপ। যারা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে তাদের নিজস্ব কোনো নেটওয়ার্ক নেই। তারা নেটওয়ার্ক ব্যবহারের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফ্রি সার্ভিস সুবিধাও নিচ্ছে। অথচ সব দায় নিতে হচ্ছে শুধু অপারেটরদের।

 

 

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সম্ভবত একমাত্র দেশ যেখানে সবচেয়ে কম তরঙ্গ দিয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষকে টেলিযোগাযোগ সেবা দিতে হচ্ছে। সরকার অতিরিক্ত তরঙ্গ বরাদ্দ করলে এবং বেতার তরঙ্গ ব্যবহারে প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করার সুযোগ দিলে গ্রাহক সেবার মান অনেক উন্নত করা সম্ভব হবে।’

মোবাইল টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কে ফাইবার অপটিক কেবল ব্যবহারের মাধ্যমে বিস্তৃত ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক মেরুদন্ড হিসেবে কাজ করে। ফলে এই ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত হওয়াও কলড্রপের অন্যতম কারণ বলে জানা যায়। তবে টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং ট্রান্সমিশন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোমের চিফ স্ট্র্যাটেজিক অফিসার সুমন আহমেদ সাবির সমকালকে বলেন, ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের জন্য কলড্রপ দেশে একেবারেই কম। মোবাইল অপারেটররা সার্বক্ষণিক চাপের মধ্যে রাখে এনটিটিএন অপারেটরদের। ফলে ব্যবসার স্বার্থেই সর্বোচ্চ মানসম্পম্ন সেবা নিশ্চিত করতে হচ্ছে এনটিটিএন অপারেটরদের।

 

একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কলড্রপের জন্য বড় একটি কারণ ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ বা আইসিএক্স। আইসিএক্স অপারেটরদের এক্সচেঞ্জের সক্ষমতার অভাবে এক অপারেটরের নেটওয়ার্ক থেকে অন্য অপারেটরের নেটওয়ার্ক, যেমন গ্রামীণ থেকে বাংলালিংক কিংবা বাংলালিংক থেকে রবিতে কল করার ক্ষেত্রে কলড্রপ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। অথচ এই আইসিএক্সের ভূমিকার কথা আলোচনাতেই আসছে না।
এই কর্মকর্তা আরও জানান, বর্তমানে নেটওয়ার্কে কলড্রপ ঠেকানোর ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঢাকায় বিপুল সংখ্যায় বহুতল ভবন গড়ে ওঠা। এ পরিস্থিতিতে বেতার তরঙ্গের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হয়। গত কয়েক বছর ধরে সেই বিনিয়োগটাও হচ্ছে না। তিনি বলেন, বকেয়া সিম প্রতিস্থাপন কর নিয়ে জটিলতা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চ কর হার এবং বিনিয়োগ ফেরত আসার অনিশ্চয়তা থেকে নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে যাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।

 

 

 

তরঙ্গের অদক্ষ ব্যবহার :মোবাইল টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কে অপরিহার্য কাঁচামাল হচ্ছে বেতার তরঙ্গ। আন্তর্জাতিক টেলিকম ইউনিয়ন প্রতিটি দেশের জন্য পৃথক ব্যান্ডে বেতার তরঙ্গের পরিমাণ নির্ধারণ করে। এই নির্ধারিত ও সীমিত বেতার তরঙ্গের দক্ষ ব্যবহারের ওপরই মোবাইল টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের সেবার গুণগত মান নির্ভর করে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বেতার তরঙ্গের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রযুক্তি নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করা হয়। এই নীতিতে পৃথক ব্যান্ডের বেতার তরঙ্গ সমন্বিতভাবে প্রয়োজন মতো বিভিন্ন প্রযুক্তির (টুজি, থ্রিজি, ফোরজি) সেবায় ব্যবহার করতে পারে অপারেটররা। অন্যদিকে বাংলাদেশে একেকটি ব্যান্ড একেকটি প্রযুক্তির জন্য নির্ধারণ করে রেখেছে বিটিআরসি। যেমন টুজির জন্য ৯০০ ও ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড, থ্রিজির জন্য ২১০০ মেগাহার্টজ, ফোরজির জন্য ৭০০ মেগাহার্টজ। এর ফলে বেতার তরঙ্গের কার্যকর ব্যবহার করে সেবার মান উন্নত করতে ব্যর্থ হচ্ছে অপারেটররা।

 

অ্যামটব মহাসচিব টি আই এম নুরুল কবীর সমকালকে বলেন, থ্রিজি চালু হওয়ার পর বেতার তরঙ্গের প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ ব্যবহারের প্রয়োজন তীব্র হয়ে পড়ে। সে সুযোগ না থাকার কারণেই টুজি এবং থ্রিজি সেবায় কার্যকর সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ছে। তিনি দাবি করেন, তারপরও মোবাইল অপারেটররা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার স্বার্থেই বাড়তি বিনিয়োগ করে গ্রাহকসেবার যথাযথ মান বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পরিকল্পনার অভাব : লার্ন এশিয়ার সিনিয়র ফেলো আবু সাঈদ খান বলেন, বেতার তরঙ্গের সর্বোচ্চ দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা বিটিআরসি নেয়নি। ফলে কোনো ক্ষেত্রে বেতার তরঙ্গের অপ্রতুলতা থেকে গেছে, আবার অন্য ক্ষেত্রে বেতার তরঙ্গের অচপয় হচ্ছে।

 

বিটিআরসি সূত্র জানায়, বর্তমানে চারটি সক্রিয় মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে প্রায় ১১৫ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ রয়েছে। এই বেতার তরঙ্গ দিয়ে ১৩ কোটি ৯৩ লাখ গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে মোবাইল ফোন অপারেটররা। অন্যদিকে ওয়াইম্যাক্স অপারেটরদের কাছে ৫০ মেগাহার্টজের বেশি বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ থাকলেও এই সেবায় বতর্মানে মোট গ্রাহক সংখ্যা মাত্র ৮৯ হাজার।
আবার মোবাইল অপারেটরপ্রতি বেতার তরঙ্গ ব্যবহারের আনুপাতিক হিসাবে দেখা যায়, গ্রামীণফোনের গ্রাহকসেবায় প্রতি ১০ লাখ গ্রাহকের জন্য ব্যবহার হচ্ছে ১.৬ মেগাহার্টজ, বাংলালিংকের ক্ষেত্রে ১.৫ মেগাহার্টজ, একীভূত রবির ১ দশমিক ২ মেগাহার্টজ এবং টেলিটকের মাত্র শূন্য দশমিক ১৫ মেগাহাটর্জ বেতার তরঙ্গ। এই হিসাব থেকে দেখা যায়, মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে বর্তমানে বেতার তরঙ্গের সবচেয়ে বেশি অপচয় বা অদক্ষ ব্যবহার হচ্ছে টেলিটকে। অনেক বেশি বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও সবচেয়ে কম সংখ্যক গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে টেলিটক।

 

বিটিআরসির বক্তব্য :বিটিআরসির সচিব সারওয়ার আলম সমকালকে জানান, বিটিআরসি প্রযুক্তিগতভাবে মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ করছে। অপারেটররা কলড্রপ হলে কী পরিমাণ কল গ্রাহককে ফেরত দিচ্ছে, তার হিসাবও বিটিআরসিকে দিচ্ছে। তারপরও কলড্রপ হচ্ছে এবং বিষয়টি বিটিআরসি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় রেখেছে। কলড্রপ কমিয়ে উন্নত গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার জন্য বিটিআরসির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ফোরজির জন্য বেতার তরঙ্গ নিলাম হওয়ার পর অপারেটরদের বেতার তরঙ্গের অপ্রতুলতা কাটবে এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নত হবে বলেও আশা করা যায়।’ ফোরজির নিলাম থেকেই বেতার তরঙ্গের প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ ব্যবহারের নীতিও চালু হবে বলে তিনি জানান।

আপনার মতামত লিখুন :