যত্রতত্র মূত্রত্যাগ ঠেকাতে: মূত্রত্যাগ ও আইন

GS News 24GS News 24
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:৫৭ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

নগরীর রাস্ত্মাঘাটে, ফুটপাথে পেশাব করা কিছু মানুষের অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। পথচারীদের পাশাপাশি কখনো কখনো মোটরবাইক ব্যবহারকারীদের মধ্যেও ইদানীং এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, রাজধানীর তেজগাঁও অঞ্চল ধরে যাচ্ছিলেন এক মোটরবাইক আরোহী। হঠাৎ করেই তিনি রাস্ত্মার পাশে বাইক থামিয়ে নেমে পড়লেন এবং দেয়ালঘেঁষে সবার সামনেই পেশাব করতে শুরম্ন করলেন। অথচ তার পেশাব করার স্থান থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে একটি পাবলিক টয়লেট অবস্থিত। মোটরবাইক আরোহী পাবলিক টয়লেট ব্যবহার না করে জনসমক্ষেই তার প্রাকৃতিক কাজটি সেরে নিলেন।
এই মোটরবাইক আরোহীর আচরণ ঢাকা শহরে এখন কোনো অদ্ভুত ঘটনা নয়। প্রায়ই এভাবে যত্রতত্র পেশাব ত্যাগ করে নগরবাসীর দুর্ভোগ বৃদ্ধি করে থাকেন অনেকেই। ঢাকাসহ বড় বড় নগরীতে বসবাসকারীদের বড় অংশের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এমনকি আশপাশে কোনো পাবলিক টয়লেট আছে কিনা, তার খোঁজ নিতেও তারা আগ্রহী নন। যেখানেই প্রাকৃতিক এই কাজের চাপ আসছে, সেখানেই সেরে নেয়াটা তাদের অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। অথচ এভাবে যেখানে-সেখানে পেশাব সেরে ফেলার কারণে নগরবাসীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কথাই ধরা যাক। জগন্নাথ হলের সীমানা প্রাচীর ধরে শামসুন্নাহার হল পর্যন্ত্ম রাস্ত্মায় মলমূত্রের উৎকট গন্ধ। হাঁটতে গেলে দম বন্ধ হয়ে আসে। এজন্য নাক চেপে ধরে প্রতিদিন ক্লাসে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের। শুধু জগন্নাথ হলের সীমানা প্রাচীর ধরে শামসুন্নাহার হল পর্যন্ত্ম রাস্ত্মা নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার অন্ত্মত আটটি স্পট আছে যেখানে এভাবেই মলমূত্র ত্যাগ করা হচ্ছে। বাধা দেয়ার বা দেখার কেউ নেই। স্পটগুলো হচ্ছে স্মৃতি চিরন্ত্মনের উল্টো পাশে ফুলার রোড়, সলিমুলস্নাহ মুসলিম হলের সীমানা প্রাচীর, কার্জন হলের বিপরীতে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের পূর্ব পাশের দেয়াল, তিন নেতার মাজারের বিপরীত পাশ, টিএসসি থেকে বিএনসিসির অফিস (তুলনামূলক কম), সড়কদ্বীপের পশ্চিম পাশ, বঙ্গবন্ধু টাওয়ারের বিপরীত পাশ, টিএসসি থেকে শাহবাগ পর্যন্ত্ম রাস্ত্মার পূর্ব পাশ, এফ রহমান হলের পূর্ব পাশের দেয়াল।
এসব এলাকায় মলমূত্র ত্যাগের ফলে সবসময় সঁ্যাতসেঁতে অবস্থা বিরাজ করে। এখানে মলমূত্র ত্যাগকারীদের অধিকাংশই রিকশাচালক, সিএনজিচালক বা ভ্যানচালক। অনেকে গাড়ি থামিয়ে পেশাব করেন এসব স্থানে। এত বেশিসংখ্যক লোক এখানে মূত্র ত্যাগ করেয, তা ড্রেন গড়িয়ে রাস্ত্মায় চলে আসে। এতে পথচারীদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একটু বৃষ্টি হলে সড়কদ্বীপের নালায় জমা হওয়া প্রস্রাবের উৎকট দুর্গন্ধে হাঁটা যায় না। বৃষ্টির পানি ও নালার পানি একত্রে মিশে অস্বস্ত্মিকর অবস্থা তৈরি করে।
পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট না থাকাতেও এই প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করেন নগরবাসীরা। ঢাকা শহরে এই মুহূর্তে ১৫ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে। তবে সে পরিমাণে পাবলিক টয়লেট রাস্ত্মাঘাটে মোটেও পর্যাপ্ত নয়। এক জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশনে মাত্র ৬৯টি পাবলিক টয়লেট রয়েছে, যার মধ্যে ১০টি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও ১০টি পরিত্যক্ত ও অব্যবহার্য অবস্থায় রয়েছে। সুতরাং পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা প্রয়োজন।
তবে একই সঙ্গে আইনেরও একটি ভূমিকা এ ক্ষেত্রে রয়েছে। ঢাকার রাস্ত্মাঘাটে যত্রতত্র মূত্রত্যাগ ঠেকাতে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একটি উদ্যোগ সবার নজর কেড়েছিল। যেসব স্থানে লোকজন বেশি বেশি মূত্রত্যাগ করে থাকে, সেখানে মূত্রত্যাগের নিষেধাজ্ঞা বাংলার পাশাপাশি আরবিতেও লেখার ব্যবস্থা নিয়েছিল ধর্ম মন্ত্রণালয়। আরবি ভাষার প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা থেকে ওসব স্থানে কিছুদিনের জন্য মূত্রত্যাগ বন্ধ ছিল এ কারণে। তবে এই উদ্যোগ ব্যাপক আকারে সফলতা পায়নি।

যেখানে-সেখানে মূত্রত্যাগ ঠেকাতে আইন প্রণয়ন ও তার বাস্ত্মবায়ন প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ নামের একটি আইন রয়েছে, যেখানে যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগের বিরম্নদ্ধে বিধান রাখা হয়েছে। ওই আইনের ৯২ ধারায় এ ধরনের কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তার জন্য শাস্ত্মির বিধানও রাখা হয়েছে। আইনটি ঢাকাসহ প্রতিটি সিটি করপোরেশনের জন্যই প্রযোজ্য। সুতরাং যারা সিটি করপোরেশনের রাস্ত্মায় এভাবে পেশাব করে জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি করছেন, তাদের এই আইনের অধীনে শাস্ত্মির আওতায় আনা যেতে পারে। ৯২ ধারায় বলা হয়েছে- এই আইনের পঞ্চম তফসিলে বর্ণিত অপরাধগুলো এই আইনের অধীনে দ-নীয় হবে। পঞ্চম তফসিলে বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সিটি করপোরেশনের অনুমতি ছাড়া আইন ভঙ্গ করে বা আইন অগ্রাহ্য করে মলমূত্র বা অন্য কোনো ক্ষতিকর পদার্থ কোনো জনপথ বা সর্বসাধারণের ব্যবহার্য কোনো স্থানের ওপর ছড়িয়ে পড়তে বা গড়িয়ে যেতে দেয়, তাহলে তার এই কাজটি আইনের লঙ্ঘন ও শাস্ত্মিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই আইনে অপরাধের শাস্ত্মি হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত্ম জরিমানার বিধান রাখা আছে। পরে একই অপরাধ সংঘটনে পাঁচ হাজার টাকার পাশাপাশি আরও পাঁচশত টাকা পর্যন্ত্ম অতিরিক্ত জরিমানা করার বিধান রয়েছে।
তবে এই আইনের সীমাবদ্ধতা হলো এই আইনটি কেবল সিটি করপোরেশনে প্রযোজ্য এবং এর বাস্ত্মবায়ন কীভাবে হবে, তার কোনো দিকনির্দেশনা আইনে নেই। মোবাইল কোর্ট আইনের অধীনে আদালত পরিচালনা করে অবশ্য ম্যাজিস্ট্রেটরা এই বিধানের বাস্ত্মবায়ন ঘটাতে পারেন। কারণ মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলে এই আইনটি অন্ত্মর্ভুক্ত রাখা আছে।

যত্রতত্র মূত্রত্যাগ ঠেকাতে জার্মানিতে প্রযুক্তির সহায়তা
যত্রতত্র মূত্রত্যাগ কেবল উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতেই সমস্যা নয়। ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতেও এর প্রবণতা রয়েছে। এতে একদিকে পরিবেশের নাভিশ্বাস উঠছে, আরেক দিকে বাড়ছে রোগ-জীবাণু। সচেতনতা চালানো হলেও কাজে আসছে না কোনো উদ্যোগই। তবে জার্মানি এ ক্ষেত্রে এক অভিনব সমাধান এনেছে। মূত্রকা- ঠেকাতে রীতিমতো নিউটনের তৃতীয় সূত্রের শরণাপন্ন হয়েছে দেশটি।
হামবুর্গের দেয়ালগুলোতে স্প্রে করা হয়েছে ‘আলট্রা এভার ড্রাই লিকুইড’। এটাকে বলে ‘হাইড্রোফোবিক কোটিং’। এতে দেয়ালের উপরিভাগটা কাজ করবে স্প্রিংয়ের মতো। এতে দেয়ালে পেশাব করলেই নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী ওই পেশাব ছুটে আসবে ব্যক্তির দিকে।
হামবুর্গ শহরের সেন্ট পাওলি জার্মানির বিখ্যাত রেড লাইট অঞ্চলগুলোর একটি। বছরে প্রায় ২ কোটি পর্যটকের আনাগোনা এখানে। যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করে পুরো এলাকাটিকে তারা বানিয়ে ফেলেছিল পেশাবখানা। রাস্ত্মায় চলতে নাক ঢাকতে হতো পর্যটকদের।

সরকারের তরফ থেকে নানা উদ্যোগ নিয়েও ঠেকানো যায়নি এ কর্ম। সেজন্যই এই প্রযুক্তি আনা হয়েছে। নতুন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভালো ফল পাচ্ছে সেন্ট পাওলি প্রশাসন। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘যে ব্যক্তি দেয়ালে একবার পেশাব  করেছে, দ্বিতীয়বার সে ভুল করেও আর ওই দেয়ালের দিকে যাচ্ছে না। কারণ তা ছিটকে এসে নষ্ট করে দিচ্ছে তার পোশাক।
আইনি কঠোরতার পাশাপাশি এরকম প্রযুক্তিগত সহায়তাও নেয়া যায় কিনা, তাও ভেবে দেখা যেতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :