পানির নিচে চট্টগ্রাম নগরী
আজহার মাহমুদ, চট্টগ্রাম অফিসঃ>>>>
বন্দর নগরীর আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিং পুল নির্মাণ নিয়ে যখন পক্ষ-বিপক্ষের লড়াই চলছে, ঠিক তখনই টানা বৃষ্টিতে পুরো চট্টগ্রাম শহর ডুবে গেছে। গতকাল শুক্রবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত টানা বৃষ্টির সাথে জোয়ারের পানি যোগ হয়ে বুক পানির নিচে তলিয়ে যায় বন্দর নগরী। এতে দিনভর দুর্ভোগ পোহান নগরবাসী।
এদিকে শত শত ফেসবুক ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নগরীর বিভিন্ন জলমগ্ন এলাকার ছবি পোস্ট করে জলাবদ্ধতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ মেতে উঠেছেন রসিকতায়। আবার কেউ কেউ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) অদক্ষতার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন। তারা পুরো চট্টগ্রাম নগরীকে সুইমিং পুল আখ্যা দিয়ে আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিং পুল নির্মাণ বন্ধের দাবি তুলেছেন। পুল নির্মাণের চেয়ে জলাবদ্ধতা থেকে নগরীকে বাঁচানোই গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন অনেকেই।
সাংবাদিক হাসান ফেরদৌস জলমগ্ন একটি এলাকার ছবি ফেসবুকে সংযুক্ত করে রসিকতা করে লিখেছেন, ‘শহরের ছেলেরা সাঁতার জানে না। তাই পুরো শহরকে এবার সুইমিং পুলের আওতায় আনা হয়েছে।’ শফিকুর রহমান লিখেছেন, ‘রাস্তাঘাটের সুইমিং পুল বড়ই চমত্কার! আউটার স্টেডিয়ামে পুলের কি দরকার?’ শায়েস্তা খান মেয়রকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিং পুল নির্মাণ না করে সামান্য বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম যে সুইমিং পুলে পরিণত হয় তার থেকে নগরবাসীকে উদ্ধার করুন। তাহলে নাগরিকদের বাহবা পাবেন।’ নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রণি লিখেছেন, ‘জলাবদ্ধতার জন্য মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না হওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু আউটার স্টেডিয়ামের খেলার মাঠ যে মাস্টারপ্ল্যানে উদ্যান হিসেবে স্বীকৃত, তা কী তিনি (মেয়র) জানতেন না ?’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বাইরেও রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, দোকানপাট- সবখানেই জলাবদ্ধতার জন্য তিরস্কৃত হচ্ছেন মেয়র ও তার প্রতিষ্ঠান চসিক। নাগরিকরা যখন এসব নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত তখন দেখা যাক, বাস্তবে রাস্তাঘাটের কি হাল! গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে- ষোলশহর, মুরাদপুর, প্রবর্তক, কাপাসগোলা, চকবাজার, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ নগরীর অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আগ্রাবাদ এলাকার এক্সেস রোড, শান্তিবাগ, শ্যামলী আবাসিক, ছোটপুল এলাকায় বুক সমান পানি উঠেছে। চকবাজার এলাকায় দেখা গেছে, সেখানকার কাঁচাবাজারটি সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন মালামাল পানিতে ভাসছে। ব্যবসায়ীরা কোনোমতে মালামালগুলো ধরে রেখেছেন।
অনেক এলাকায় মানুষ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে চরম বিপদে পড়েছেন। মাঝপথেই গাড়ি আটকে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। কাপাসগোলা, প্রবর্তকসহ নগরীর অনেক এলাকাতেই ইঞ্জিন বিকল হয়ে রাস্তায় শত শত সিএনজি অটোরিকশা আটকে যায়। পেটের দায়ে রিকশাচালকরা রাস্তায় বেরিয়ে এলেও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন অনেকেই। অনেক বাসাবাড়িতেও পানি ঢুকে গেছে। চুলোয় আগুন নিবে গেছে। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে।
দুপুরের পর থেকে আস্তে আস্তে পানি কমতে থাকলেও বিকালে জোয়ারের সময় পুনরায় বেশকিছু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে, শুক্রবার সকাল সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত আবহাওয়া অফিস ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে। এছাড়া গতকাল ভোর রাত তিনটা থেকে কর্ণফুলীতে জোয়ার শুরু হয়ে সকাল সাড়ে নয়টায় ভাটা শুরু হয়। বিকাল ৩টা ৩৪ মিনিটে আবার জোয়ার আসে।
চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন নগরীর বেশকিছু জলমগ্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন। জলাবদ্ধতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। যদিও তার দাবি- কেবল নিচু এলাকাগুলোতেই জলজট তৈরি হয়েছে। এর প্রধান কারণ জোয়ারের পানি। চসিকের কর্মীরা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে মেয়র বলেন, তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে জলাবদ্ধতা পেয়েছেন। আগের মেয়ররা মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না করায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক খাল বেদখল হওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, কর্ণফুলীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং না হওয়া, পাহাড় থেকে বালু নেমে ড্রেন ভরাট হওয়ার কারণে জলাবদ্ধতা হচ্ছে।
মেয়র দাবি করেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দুই বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় কোনো বাজেট পাননি। কেবল নিজস্ব ফান্ড থেকে নিয়মিত খালের মাটি উত্তোলন ও ড্রেন পরিষ্কার করেছেন। এগুলো খুবই ছোট কাজ। অর্থছাড় না হওয়ায় বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খননের কাজও এগোচ্ছে না বলে তিনি জানান।
চসিক সূত্র জানায়, বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর বৃষ্টি ও জোয়ারের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দূর করতে ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় ‘চট্টগ্রাম নগরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসন’ নামে তিন হাজার কোটি টাকার বৃহত্ সমন্বিত একটি প্রকল্পের ডিপিপি পাঠানো হয়েছে, যেটি এখন একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এই প্রকল্পের আওতায় ৪০টি খালে স্লুইসগেট, প্রতিরোধ দেয়াল ও চাক্তাই, রাজাখালী, মরিয়ম বিবি খালসহ ১০টি বড় খালে পাম্প বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম শহর পুরোপুরি জলাবদ্ধতামুক্ত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অর্থায়নে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের বিষয়টিও এ মাসে চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়েছেন মেয়র।
প্রসঙ্গত, এর আগের দুই মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও মনজুর আলমের আমলেও চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে খালের মাটি উত্তোলন, রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এরপরও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পায়নি চট্টগ্রামবাসী।



