আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় নিহত কিশোর আফিফ কাদেরীর শরীরে একাধিক গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তার ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক।
স্টাফ রির্পোটার: পুলিশ বলছে, ১৪ বছর বয়সী আফিফ আজিমপুর অভিযানে নিহত জঙ্গি তানভীর কাদেরীর যমজ দুই ছেলের একজন।
সোমবার ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তার শরীরে একাধিক গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। গুলির কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই কিশোরের শরীরে কোনো স্প্লিন্টার বা বিস্ফোরণের ক্ষত তিনি দেখেননি।
ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ছেলেটির থাই মাসল, চুল ও দাঁত এবং ভিসেরা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান এই চিকিৎসক।
শনিবার প্রথম প্রহরে আশকোনার ওই তিনতলা ভবন ঘিরে পুলিশের অভিযান শুরুর পর সকালে দুই শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে এসে আত্মসমর্পণ করেন পলাতক জঙ্গি রাশেদুর রহমান সুমনের স্ত্রী শাকিরা ওরফে তাহিরা (৩৫) এবং মিরপুরে নিহত নব্য জেএমবির নেতা সাবেক মেজর জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নাহার ওরফে শিলা ওরফে সুমাইয়া ওরফে মারজুন (৩৪)।
অভিযানের এক পর্যায়ে পলাতক জঙ্গি রাশেদুর রহমান সুমনের স্ত্রী শাকিরা ওরফে তাহিরা (৩৫) এক শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে এসে কোমরে বাঁধা গ্রেনেড ফাটিয়ে আত্মঘাতী হন। আর অভিযান শেষে ওই বাসার ভেতরে আফিফের লাশ পাওয়া যায় বলে জানানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে।
আফিফ আত্মসমর্পণের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছিল না জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সেদিন বলেন, “ছেলেটি কিছুতেই আত্মসমর্পণ করছিল না। তখন আমাদের পুলিশ গ্যাস নিক্ষেপ করে। সে গুলি চালানো শুরু করে। তখন ভেতরে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে আমাদের পুলিশ দেখে সেখানে সে মৃত অবস্থায় পড়ে আছে।”
তবে রোববার ওই ঘরে থাকা ১৯টি গ্রেনেড নিষ্ক্রিয় করে আফিফের লাশ উদ্ধারের পর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেন, “অভিযান চলার সময় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে প্রতিরোধ করেছিল। সে আত্মহত্যা করেছে, না কি অভিযানে তার মৃত্যু হয়েছে, তা ময়নাতদন্তে জানা যাবে।”
অভিযানের দিন স্থানীয় এক কিশোরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাদেরীর ওই ছেলে এলাকায় নিজের নাম বলত শহীদ কাদেরী।
“আমরা একসঙ্গে খেলাধুলা করতাম; ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট… সে (কাদেরীর ছেলে) প্রায়ই আমাকে তার বাসায় ডেকে নিত।
“অনেক সময় আমি যেতে না পারলে পরদিন আমার বাসায় চলে আসত। আমাকে ধর্মীয় গান শোনাত, জিহাদের কথা বলত। রাতে প্রায়ই আমাকে তার বাসায় থাকতে বলত। বলত- ধর্ম নিয়ে কথা আছে।”
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বাসায় ডেকে নিয়ে জিহাদে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল বলে জানায় এই কিশোর।
“ওইদিন বিকালে তার বাসায় নাশতা করতে করতে সে বলে- ইসলামের পথে আসতে হবে, বন্দুক হাতে নিতে হবে, জিহাদ করতে হবে।”
আফিফের বাবা তানভীর কাদেরী এক সময় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং শাখার কর্মকর্তা ছিলেন। আর তানভীরের স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা ছিলেন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘সেইভ দ্য চিলড্রেন’ এর কর্মকর্তা।
গোয়েন্দারা বলছেন, তামিম চৌধুরী নিহত হওয়ার পর নব্য জেএমবির সমন্বয়কের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছিলেন কাদেরী। ‘আব্দুল করিম’ ও ‘শমসেদ’ নামে সংগঠনে পরিচিত ছিলেন তিনি। করিম নাম ব্যবহার করেই তিনি বসুন্ধরা আবাসিকে গুলশান হামলাকারীদের জন্য ফ্ল্যাট ভাড়া করেছিলেন।
গত ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরের একটি বাড়িতে পুলিশি অভিযানের সময় টিকতে না পেরে তানভীর আত্মহত্যা করেন বলে পুলিশের ভাষ্য।
তখন ফাতেমার সঙ্গে গুলশান হামলায় জড়িত নুরুল ইসলাম মারজানের স্ত্রী আফরিন ওরফে প্রিয়তি এবং জেএমবি নেতা বাসারুজ্জামান চকলেটের স্ত্রী শারমিন ওরফে শায়লা আফরিনকে পুলিশ আহত অবস্থায় আটক করে।
ওই তিন নারী মরিচের গুঁড়া ও ছোরা নিয়ে হামলা চালিয়েছিলেন বলে সেদিন পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। তিনজনের মধ্যে একজন পুলিশের গুলিতে আহত হন, বাকি দুজন ছুরি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে জানায় পুলিশ।
তানভীর-ফাতেমা দম্পতির জমজ ছেলেদের একজনকে আজিমপুরের ওই অভিযানের সময় আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়। তার সাড়ে তিন মাস পর আশকোনার সূর্য ভিলায় আরেক ছেলের খোঁজ পেয়েই পুলিশ অভিযানে যায় বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল।



