প্রশ্নফাঁসের ঝুঁকি নিয়ে এইচএসসি পরীক্ষাশুরু
স্টার্ফ রিপোর্টার:
সরকারের নানা উদ্যোগের পরও প্রশ্নফাঁসের ঝুঁকি নিয়ে আজ সারাদেশে একযোগে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা শুরম্ন হচ্ছে।
এবারের পরীক্ষায় ১৩ লাখ ১১ হাজার ৪৫৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়ার কথা। এর মধ্যে ৬ লাখ ৯২ হাজার ৭৩০ জন ছেলে এবং ৬ লাখ ১৮ হাজার ৭২৭ জন মেয়ে রয়েছে। ২ এপ্রিল বাংলা প্রথম পত্র দিয়ে শুরম্ন হয়ে ১৩ মে ইসলাম শিক্ষা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এ পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৯৪১ জন, মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ১ লাখ ১২৭ জন, কারিগরি থেকে ১ লাখ ১৭ হাজার ৭৫৪ জন এবং ডিআইবিএসের অধীনে ৯৬৯ জন পরীক্ষায় অংশ নেবে।
এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করে। ওই বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৬ লাখ ৫১ হাজার ৫১৩ জন পরীক্ষার্থী। এর দুই বছরের মাথায় এসে আজ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১৩ লাখ ১১ হাজার ৪৫৭ জন পরীক্ষার্থী। যা ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের চেয়ে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৫৬ জন কম।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো ২০১৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ছেলেদের চেয়ে মেয়ে পরীক্ষার্থী বেশি ছিল ১৯ হাজার ২৬০ জন। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়াদের মধ্যে ছেলেদের চেয়ে মেয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশিতো দূরে থাক বরং ৭৪ হাজার ৩ জন কম। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান বু্যরোর তথ্য বিশেস্নষণ করে আরও দেখা গেছে, ছেলেদের চেয়ে প্রায় এক লাখ মেয়ে পরীক্ষার্থী বেশি ঝরে পড়েছে। অর্থাৎ ঝরে পড়ার এ হার ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ।
ব্যাপক সংখ্যায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ মহিতুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাপক সংখ্যায় পরীক্ষার
চাপ শিক্ষার্থীদের পক্ষে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এখন প্রতি এক-দুই বছর পরপর বড় বড় একেকটি পাবলিক পরীক্ষা ফেস করতে হয় শিক্ষার্থীদের। যাতে তারা অনেকটাই ক্লান্ত্ম। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যেভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে তাও শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে। মেয়েদের এই বিশাল সংখ্যায় ঝরে পড়ার হারটি ভীষণ উদ্বেগের। বাল্যবিবাহ, রক্ষণশীলতা, পথেঘাটে নিরাপত্তার অভাবসহ নানা কারণে মেয়েদের দ্রম্নত বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এটি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।’
গত ফেব্রম্নয়ারিতে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষার প্রায় সব বিষয়েই প্রশ্ন ফাঁস হয়। যে কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ করা গেছে। এরই মধ্যে দেশের সব কোচিং সেন্টার বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এর পরও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গত কয়েক দিনে প্রশ্নফাঁসের বিজ্ঞাপন দেয়ার খবর পাওয়া গেছে।
প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে মহিতুল ইসলাম বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য একটি সামাজিক ব্যাধি হয়ে দেখা দিয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও এসব দুষ্কৃতকারীদের তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান আমাদের আইটি বিশেষজ্ঞদের চেয়ে বেশি। যে কারণে গোয়েন্দাসহ রাষ্ট্রের সব অঙ্গ একসঙ্গে কাজ করেও এদেরে ধরতে পারছে না। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে রাষ্ট্রের দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া এটাকে বন্ধ করা সম্ভব হবে না।’
পরীক্ষায় অংশ নেয়ার দিক দিয়ে ছেলেমেয়ের ব্যবধান ভীষণভাবে বেড়েছে। এবারের পরীক্ষায় ৬ লাখ ৯২ হাজার ৭৩০ জন ছেলের বিপরীতে ৬ লাখ ১৮ হাজার ৭২৭ জন মেয়ে পরীক্ষায় অংশ নেবে। ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা ৭৪ হাজার ৩ জন কম। শতকরা হিসেবে এ ব্যবধান প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ।
এবারের মোট পরীক্ষার কেন্দ্র সংখ্যা ২ হাজার ৫৪১টি। যা গতবার ছিল ২ হাজার ৪৯৭টি এবং ২০১৮ সালে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৪২ হাজার ৪২৬ জন।
এবারের পরীক্ষায় মোট ২৮টি বিষয়ের মধ্যে ৫৪টিতে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
তত্ত্বীয় পরীক্ষা ২ এপ্রিল ২০১৮ সোমবার থেকে শুরম্ন হয়ে ১৩ মে ২০১৮ রোববার এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা ১৪ মে ২০১৮ থেকে শুরম্ন হয়ে ২৩ মে ২০১৮ শেষ হবে।
এবারের পরীক্ষা শুরম্নর ৩০ মিনিট পূর্বে পরীক্ষার্থীদের অবশ্যই পরীক্ষা কক্ষে আসন গ্রহণ করতে হবে। যদি কেউ দেরি করে তবে তাকে মুচলেকা দিয়ে পরীক্ষার কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। একাধিক দিন এমন দেরি হলে পরীক্ষা কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ তার পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। পরীক্ষা শুরম্নর ২৫ মিনিট পূর্বে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মোবাইল নম্বরে সেট কোড ব্যবহারের নির্দেশনার এসএমএস যাওয়ার পর প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলতে হবে।
কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ব্যতীত অন্য কেউ মোবাইল ফোন/ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছবি তোলা যায় না এমন মোবাইল ফোন ব্যবহার করার আদেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়া কেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে কোনো মোবাইল ফোন পাওয়া গেলে শাস্ত্মিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
এইচএসসিতে ২০১২ সালে শুধু বাংলা ১ম পত্রের সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১৫ সাল পর্যন্ত্ম ১৩টি বিষয়ের ২৫টি পত্রে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সাল থেকে সর্বমোট ২৮টি বিষয়ের ৫৪টি পত্রে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এবারের পরীক্ষা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, সেরিব্রাল পালসিজনিত প্রতিবন্ধী এবং যাদের হাত নেই এমন প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থী স্ক্রাইব (শ্রম্নতি লেখক) সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। এ ধরনের পরীক্ষার্থীদের এবং শ্রবণ প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ২০ মিনিট সময় বরাদ্দেরও সুযোগ দেবে কর্তৃপক্ষ।
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন (অটিস্টিক এবং ডাউন সিনড্রোম বা সেরিব্রালপালসি আক্রান্ত্ম) পরীক্ষার্থীদের ৩০ মিনিট অতিরিক্ত সময় এবং পরীক্ষার কক্ষে তার অভিভাবক/শিক্ষক/সাহায্যকারী নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়া হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সার্বক্ষণিকভাবে সারাদেশের এইচএসসি ও সমমানের সব পরীক্ষা তদারকির ব্যবস্থা থাকবে বলেও মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে।
শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর মোট পরীক্ষার্থী, উপস্থিতি, অনুপস্থিতি ও বহিষ্কারসহ সার্বিক তথ্য আদান প্রদানের ক্ষেত্রে পূর্বের মতোই চালু থাকার কথা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে ব্যাপক সংখ্যায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়া এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে জানতে চাইলে এ বিষয়ে কারো কোনো মন্ত্মব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছে, ‘অতীতে কি হয়েছে তারচেয়ে আজ কি হবে সেটা নিয়েই মন্ত্রণালয় বেশি চিন্ত্মিত। যে কোনো মূল্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধই সরকারের মূল লক্ষ।’ এর বাইরে মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তার আর কোনো মন্ত্মব্য করতে রাজি হয়নি।
এসএসসির প্রশ্নফাঁসের পর আদালতের নির্দেশে গঠিত তদন্ত্ম কমিটির প্রধান ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ মনে করেন, এসব উদ্যোগের ফলে সোমবার থেকে শুরম্ন হতে যাওয়া এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে না।
কায়কোবাদ বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের নজরদারি জোরদার করেছে যেন প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয়।’
তবে এটা মনে রাখতে হবে প্রশ্নপত্র কিন্তু বেশ কিছুদিন আগেই প্রণীত হয়ে গেছে। আমাদের সিস্টেমে এই প্রশ্নপত্র বিভিন্ন সময় আড়াইশ থেকে পৌনে তিনশ মানুষের দেখার সুযোগ থাকে।
তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করছে প্রশ্নপত্র পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার সময় তা ফাঁস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই সম্ভাবনা রোধ করতে এবার বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বোর্ড কর্তৃপক্ষের ধারণা হয়েছে ভল্ট কিংবা ট্রেজারি থেকে যখন প্রশ্নপত্র পরীক্ষা কেন্দ্রে যায় তখন তা ফাঁস হয়ে যায়। সেটি যদি সত্য হয় তাহলে আমি আশা করি এবারের এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দুষ্টচক্রে পড়বে না।’
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কোচিং সেন্টার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত্মের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে কায়কোবাদ বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের সবরকমের সম্ভাবনা বন্ধ করার জন্যই এমন সিদ্ধান্ত্ম নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তিনি বলেন, পরীক্ষা শুরম্নর ২৫ মিনিট আগে সিদ্ধান্ত্ম নেয়া হবে কোনো সেটে পরীক্ষা হবে। প্রশ্নফাঁস হয়ে গেলে একজনকে দুটি প্রশ্নপত্রই পড়ে আসতে হবে। যেটি খুবই সম্ভব। এই সম্ভাবনা ঠেকাতেই কোচিং সেন্টার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত্ম নেয়া হয়েছে।
তদন্ত্ম কমিটি এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণ চিহ্নিত করতে পেরেছে কিনা জানতে চাইলে কায়কোবাদ বলেন প্রশ্নপত্র ট্রেজারি বা ভল্ট থেকে কেন্দ্রে যাওয়ার সময় সম্ভাবনা কম।
তিনি বলেন, ‘ঐ তদন্ত্মে ডিবি এবং সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন। তারা মনে করছেন এসএসসির প্রশ্নপত্র আগে থেকে ফাঁস হয়েছে। ট্রেজারি কিংবা ভল্ট থেকে হয়নি। সেটি অবশ্যই বড় একটি সমস্যা, এই সমস্যা নিয়ে আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওয়াকিবহাল।’



