চোখের জলে নদীর জলে ভিজল পরীক্ষার খাতা
স্টাফ রিপোর্টার:>>>
ডুবে গেল জেএসসি পরীক্ষার্থী ভরা একটি নৌকা। কেউ প্রাণ হারাল, কেউ কোনো মতে বেঁচে ভেজা কাপড়েই বসল পরীক্ষার হলে।
দুই সহপাঠী হারানোর বেদনা তাদের তাড়া করছিল। পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে লিখতে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছিল কেউ কেউ। সেই কান্নায় ভিজেছে পরীক্ষার খাতা। বিভীষিকার মুখোমুখি কোমলমতি শিশুরা বুঝে উঠতে পারছিল না কোনো কিছু। তাদের চোখেমুখে ভাসছিল আতঙ্ক আর মর্মান্তিক সব দৃশ্য।
গতকাল বুধবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর কৃষ্ণনগর এলাকায় পাগলা নদে প্রায় দেড় শ জেএসসি পরীক্ষার্থী নিয়ে ডুবে যায় নৌকাটি। এ ঘটনায় দুই পরীক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। আহত হয় আরো অনেকে। বাকি শিক্ষার্থীরা হতবিহ্বল হয়ে কিনারায় উঠে আসে।
তারা সবাই বীরগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী। পরীক্ষার জন্য কৃষ্ণনগর আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে আসছিল।
নিহত ওই দুই শিক্ষার্থীর নাম নাদিরা ও সোনিয়া। নাদিরা নবীনগর উপজেলার আমতলী গ্রামের সাইদ হোসেনের মেয়ে। সোনিয়া নজর দৌলত গ্রামের ইকবাল মিয়া ওরফে শিশু মিয়ার মেয়ে। গতকাল বিকেলে নিজ নিজ এলাকায় তাদের লাশ দাফন করা হয়। এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। শ শ মানুষ নাদিরার বাড়িতে ভিড় জমায়। নাদিরার মা আফরোজা বেগম বারবার সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। অসুস্থ হয়ে যাওয়া বাবা ক্লিনিকে চিকিত্সা নেন। পরিবারের লোকজন জানায়, সকালে সবাইকে সালাম করে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় নাদিরা। নাদিরা চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখত।
গতকাল কৃষ্ণনগর আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পরীক্ষা দেওয়া অবস্থাতেই দুই ঘণ্টার মাথায় ইসরাত আক্তার নামে এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরীক্ষাকেন্দ্রেই প্রাথমিক চিকিত্সা শেষে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় হাসপাতালে। শঙ্কামুক্ত হলেও শোকগ্রস্থ ইসরাত আক্তার সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি। দুই সহপাঠীর মৃত্যু খুব কাছ থেকে দেখে অনেকেই শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল খালেক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমানসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনার জন্য কেউ দায়ী হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও আশ্বাস দিয়েছেন তাঁরা। শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেন।
অতিরিক্ত বোঝাইয়ের কারণে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাহেদুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানবীর সালেহীন গাজী ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল থেকে জেএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। মোট চারটি স্কুলের পরীক্ষার্থীর কেন্দ্র নবীনগরের কৃষ্ণনগর আব্দুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ। ওই প্রতিষ্ঠানে সিট পড়া বীরগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা থানাকান্দি এলাকা থেকে দুটি নৌকায় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে আসছিল। এর মধ্যে একটি নৌকা কৃষ্ণনগর এলাকার ঘাটের কাছে এসে ডুবে যায়।
শ্রাবন্তী, আলেয়াসহ আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, ঘাটের কাছে সেতু পার হওয়ার সময়ে নৌকায় একটা শব্দ হয়। অনতিদূরে নৌকাটি বাঁক নেওয়ার সময় এক পাশে কাত হয়ে ডুবে যেতে থাকে। এ সময় নৌকার ছাউনির ওপর ও ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরা চিত্কার শুরু করে ও লাফিয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন নৌকা নিয়ে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আকলিমা আক্তার নামের এক শিক্ষার্থী বলে, ‘ওড়না পেঁচিয়ে নৌকায় আটকে ছিলাম। স্থানীয় এক ব্যক্তি আমাকে উঠিয়ে বুকে চাপ দিয়ে পেট থেকে পানি বের করে। সেখান থেকে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ’
উদ্ধারকাজ করা নৌকার মাঝি জাহের মিয়া, আমীর হোসেন জানান, নৌকাটি ডুবতে দেখেই তাঁরা সেখানে ছুটে যান। অনেকে সাঁতার কাটছিল। অনেকে আবার পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছিল। সাত-আটটি নৌকায় করে তাঁরা শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করেন। তবে পানি খুব বেশি একটা না হওয়ায় সমস্যা হয়নি।
নৌকাডুবি থেকে রক্ষা পাওয়া শিক্ষার্থী নূর মোহাম্মদ, দিদার হোসেন জানায়, তাদের ভেতর এ নিয়ে ভয় কাজ করছে। এখন থেকে আর তারা নৌকায় করে আসতে চায় না। প্রয়োজনে ছয় কিলোমিটার পথ হেঁটে এসে পরীক্ষায় অংশ নেবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন একটি সড়ক সেতুর কাছে কৃষ্ণনগর নৌকাঘাট। সেতুর একটি পিলারের কাছে বাঁশ পোঁতা থাকতে দেখা যায়। ঘাটের কাছে রয়েছে একটি ঘের। মূলত ওই ঘেরকে পাশ কাটিয়ে আসার জন্যই শিক্ষার্থীদের বহনকারী নৌকাটিকে বেশি বাঁক নিতে হয় বলে স্থানীয় অনেকে অভিমত ব্যক্ত করে।
স্কুল শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা জানান, থানাকান্দি থেকে কৃষ্ণনগরের দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটার। কিন্তু সড়কপথে আসার সহজ কিংবা সরাসরি কোনো রাস্তা নেই। বীরগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার জন্য ২০০ টাকা করে নেয়। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৮৮ জন ছাত্রী ৯৬ জন ছাত্র (মোট ২৮৪ জন) অংশ নেওয়ার কথা। এর মধ্যে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী দুটি নৌকায় করে আসছিল। এর মধ্যে শিক্ষকরা যে নৌকাটিতে ছিলেন সেটিতে কম শিক্ষার্থী ওঠানো হয়। পেছনে থাকা সেই নৌকাটি নিরাপদেই ঘাটে গিয়ে পৌঁছে।
বিদ্যালয়ের এ ব্লকের দ্বিতীয় তলার ১০ নম্বর কক্ষে পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল সোনিয়া আক্তারের। ওই কক্ষের প্রথম সারির প্রথম বেঞ্চটির এক পাশে বসার কথা ছিল তার। পরীক্ষা শুরুর পর সংশ্লিষ্টরা ওই হলে গিয়ে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বেঞ্চটির দিকে। শিক্ষার্থীরা আঙুল উঁচিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় সংশ্লিষ্টদের বেঞ্চটি দেখিয়ে দেয়।
ওই হলে পরিদর্শকের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পরীক্ষার তিন ঘণ্টা সময়জুড়েই হলটিতে ছিল অন্য রকম পরিবেশ। পরীক্ষার্থীরা প্রায় সময়ই কেঁদে কেঁদে ওঠে। শোকাবহ পরিবেশের মধ্য দিয়ে হলটিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ’
কৃষ্ণনগর আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের কেন্দ্রসচিব ফেরদাউসুর রহমান বলেন, ‘বীরগাঁওয়ের ওই প্রতিষ্ঠানের মোট ২৬৬ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী দুটি নৌকায় করেই আসে বলে জানতে পেরেছি। ৯টা বাজার ৫ মিনিট আগে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ কনস্টেবল নাজমুলকে নিয়ে আমি ঘাটের দিকে যাই। ওই পুলিশ সদস্যসহ স্থানীয় লোকজন তাত্ক্ষণিকভাবে উদ্ধারকাজে নেমে পড়ে। ’
বীরগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. নাজির হোসেন বলেন, ‘মোট ১১৫ জন শিক্ষার্থী নৌকায় করে আসার জন্য টাকা দেয়। এ জন্য সবচেয়ে বড় দুটি নৌকা ভাড়া করা হয়। তবে টাকা না দেওয়া কয়েক শিক্ষার্থীও নৌকায় ওঠে। কিন্তু এতে অতিরিক্ত বোঝাই হওয়ার মতো কিছু হয়নি। এখন আমাকে বিপদে ফেলার জন্য অনেক কথা বলা হচ্ছে। ’
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. জহির রায়হান বলেন, ‘এটি অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা। এ ঘটনায় আমরা শোকগ্রস্ত। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছি। ’ নৌকায় অতিরিক্ত বোঝাই হওয়ার বিষয়টি সঠিক নয় বলে তিনিও দাবি করেন।
ঘাটের কাছের ঘের মালিক মো. বোরহান বলেন, ‘এ ধরনের ঘের নদীর বিভিন্ন এলাকাতেই রয়েছে। ঘেরের জন্য সমস্যা হয়নি। মূলত নৌকাটি একদিকে কাত হয়ে ডুবে যায়। স্থানীয় লোকজন তাত্ক্ষণিকভাবেই উদ্ধারকাজে নামে। ’
নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসলাম সিকদার বলেন, ‘নৌকায় অতিরিক্ত বোঝাই ছিল বলে মনে হচ্ছে। ঘাটের কাছে এসে কিছু একটার সঙ্গে একটি ধাক্কাও খায় নৌকাটি। একপর্যায়ে কাত হয়ে নৌকাটি ডুবে যায় বলে জানতে পেরেছি। ’
নবীনগরের ইউএনও তানবীর সালেহীন গাজী জানান, ঘটনার পর পর পরীক্ষাকেন্দ্র ও এর আশপাশে অন্য রকম পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরীক্ষা না নেওয়ার জন্য বিক্ষুব্ধ লোকজন জড়ো হয়ে চেঁচামেচি করতে থাকে। তাদের শান্ত করে সময়মতো পরীক্ষা নেওয়া হয়। দুর্ঘটনার কবলে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা চলার সময়ে এক প্রকার আতঙ্ক লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবরে তারা মুষড়ে পড়েছিল।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্র বলেন, ‘আগামীতে যেন কোনো শিক্ষার্থীকে ঝুঁকি নিয়ে কেন্দ্রে না যেতে হয় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে শিগগিরই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি লেখা হবে। খুব সহজেই যেন যাওয়া যায় এমন সব কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে এ চিঠি লেখা হবে। ’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান জানান, খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে যেন পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে আসে সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. বাহাদুর রহমান বলেন, ‘আমি কিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, এত বোঝাই নৌকায় তারা আসতে চায়নি। কেন এভাবে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসা হলো সে বিষয়ে ইউএনও ব্যবস্থা নিতে পারেন। ’
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক বলেন, ‘এটি একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা। দুর্ঘটনার খবরটি শুনেই আমি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে সঙ্গে নিয়ে ছুটে আসি। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে এ নিয়ে যোগাযোগ করি। সব কিছু সামলে পরীক্ষা ঠিকমতো হওয়ায় সিদ্ধান্তটা যথাযথ হয়েছে। ’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যাতায়াতের জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে টাকা নেওয়া হয়েছে। একটি নৌকায় বেশি শিক্ষার্থী বহন করা হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় যদি কেউ দায়ী হয়ে থাকে তাহলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’



