একহাতের ইতিহাস হার না মানা এক মানুষের গল্প!

জিএস নিউজ ডেস্কজিএস নিউজ ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১০:০৬ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

অনলাইন ডেস্ক:>>>

সেটা ১৯৩৮ সালের কথা.. হাঙ্গেরির সেনা বাহিনীতে ক্যারোলি নামে একজন সৈনিক ছিলেন। শুধু সৈনিক হিসেবেই নন, হাঙ্গেরির সেরা শুটারও ছিলেন তিনি। নাম ক্যারোলি কাকাস! তার অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ করার ক্ষমতা জাতীয় পর্যায়েও সুনাম বয়ে আনে। সে বছর হাঙ্গেরির সবগুলো শুটিং প্রতিযোগিতায় এক নায়কে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। অর্থাৎ সেই দেশের সবগুলো প্রতিযোগিতায় সেরা পুরস্কারগুলো নিজেই আদায় করে নেন ক্যারোলি।

 

এমন শার্প শুটারকে নিয়ে তাই দেশবাসীর আশাও ছিল ব্যাপক। সবাই প্রায় নিশ্চিত ছিলেন যে, ১৯৪০ সালে হতে যাওয়া অলিম্পিক প্রতিযোগীতায় পিস্তল ক্যাটেগরিতে স্বর্ণপদক পাবেন ক্যারোলি। তার নিজেও অবশ্য সেটাই স্বপ্ন ছিল। একারণেই বছরের পর বছর তিনি অদম্য সাধনা করেছিলেন।

তার একটাই স্বপ্ন ছিল, বিশ্বের বুকে নিজেকে সেরা শুটার বানানো। তার দক্ষতাও সেই পর্যায়েই নিয়ে যান ক্যারোলি। মাত্র ২ বছর বাদেই হাতে আসতে চলেছিল সেই স্বীকৃতি।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক! ১৯৩৮ সালেই হাঙ্গেরির সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণকালে তার জীবনে ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা। আর্মির ট্রেনিং ক্যাম্পে থাকাকালে গ্রেনেড ছুঁড়তে গিয়ে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। যে ডান হাত দিয়ে ক্যারোলি এতদিন অলিম্পিকে স্বর্ণ জয়ের স্বপ্ন দেখতেন, সেই হাতেই বিস্ফোরিত হয় একটি হ্যান্ড গ্রেনেড।

হাত হারিয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা তখন তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন, জীবনে তার দুটি পথ খোলা রয়েছে! বাকি জীবন নিজেকে আড়ালে রেখে আক্ষেপ আর হতাশা নিয়ে কাটিয়ে দেয়া। অথবা জীবনের অপূর্ণ লক্ষ্যকে জয় করতে সংগ্রাম করা।

ক্যারোলি দ্বিতীয় পথটাকেই বেছে নিলেন। বুঝলেন, হতাশা তার জীবনকে দু:সহ করে তুলবে। বেঁচে থেকে মরে থাকার চাইতে বরং যুদ্ধ করাই শ্রেয়। একজন সৈনিকের লক্ষ্যও যে তাই!

যা ভাবা তাই কাজ! এক মাস পর হাসপাতাল থেকে সুস্থ্য হয়ে ফিরে একমাত্র বাম হাতকে শানিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করলেন। অতীতের সব কিছু ভুলে মনোযোগ দিলেন বর্তমানে! যে বাম হাত দিয়ে তিনি লিখতে পর্যন্ত পারতেন না, সেই হাতকেই স্বপ্ন পূরণের কাজে ব্যবহার করা শুরু করলেন!

সবার নজর এড়িয়ে দীর্ঘ এক বছর প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৩৯ সালে হাঙ্গেরির জাতীয় পর্যায়ের পিস্তল প্রতিযোগিতায় হাজির হন ক্যারোলি। দেশের শ্যুটারদের কাছে তিনি ব্যপকভাবে পরিচিত ছিলেন। তারা ক্যারোলির দুর্ঘটনার কথাও জানতেন! তাই প্রতিযোগীরা ভাবলো হয়তো তাদের উৎসাহ জোগাতে হাজির হয়েছেন ক্যারোলি।

ক্যারোলি উপস্থিত সব প্রতিযোগীদের অভিনন্দন জানালেন। এরপর যখন তাদের কাতারেই দাঁড়ালেন, তখন সবার অবাক হওয়ার পালা! অবশ্য অবাক হওয়ার তখনও বাকি ছিল। প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বাম হাত দিয়েই সেরা পুরস্কার জিতে নেন ক্যারোলি। তিনি যে গত ১ বছর বাম হাতেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন সেটা তো কারও জানার কথা নয়! পুরস্কার ছিনিয়েই ক্যারোলি তা সবাইকে জানিয়ে দিলেন।

এরপর বাম হাতেই প্রস্তুতি নিতে থাকেন স্বপ্নকে জয় করতে। সিদ্ধান্ত নিলেন তার একমাত্র হাতকেই বিশ্বসেরা শুটিং হ্যান্ড বানাবেন। সময় তখনও ছিল এক বছর। অর্থাৎ ১৯৪০ সালে হতে যাওয়া অলিম্পিক গেমসে অংশ নিতে তিনি প্রশিক্ষণ শুরু করলেন।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তার স্বপ্ন পূরণের পথকে থমকে দেয়। যুদ্ধের কারণে ১৯৪০ সালের অলিম্পিক আসর বাতিল হয়ে যায়। অবশ্য আগেই হতাশা শব্দটি তার অভিধান থেকে বাদ দিয়েছিলেন। ক্যারোলি তাই মনোযোগ দিলেন ১৯৪৪ সালের অলিম্পিক আসরে নিজেকে প্রস্তুত করতে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ১৯৪৪ সালের অলিম্পিক আসরও বাতিল হয়ে যায়।

ক্যারোলি তাই মনোযোগ দিলেন পরবর্তী অলিম্পিক আসরের জন্য। যেটি ১৯৪৮ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময় তো বহমান! পরপর দুটি আসর বন্ধ হওয়ায় অপেক্ষার প্রহর ৮ বছর দীর্ঘ হয়। বয়সও বাড়তে থাকে।

ডান হাত হারানোর সময় অর্থাৎ ১৯৩৮ সালে তার বয়স ছিল ২৮ বছর। কিন্তু ১৯৪৮ সালে তার বয়সও দাঁড়ায় ৩৮ বছর! প্রতিযোগী হিসেবে সেটাই ক্যারোলির স্বপ্নজয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। কেননা, তিনি যাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামবেন তারা সবাই তরুণ!

কিন্তু ‘অসম্ভব’কে সম্ভব করার প্রত্যয় নিয়েই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন ক্যারোলি। তাই সব দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে তিনি অংশ নিলেন অলিম্পিক আসরে। এরপর যা করলেন তা ইতিহাস! সব বাধাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্যারোলি প্রথমবারের মতো অলিম্পিক গেমসে স্বর্ণপদক জয় করলেন। তার বাম হাতের কাছে হার মানলেন বিশ্বের সব শুটার।

স্বপ্ন জয়ের পরও ক্যারোলি থামেননি। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের অলিম্পিকেও শুটিং’এ স্বর্ণপদক তিনি জয় করেন! সেবার পরপর দু’বার স্বর্ণপদক জয়ের মাধ্যমে ক্যারোলি এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেন। যা দু’হাত থাকা প্রতিযোগীরাও পারেননি!

প্রতিকূল স্রোতে জীবন তরীকে এগিয়ে যাওয়া এসব মানুষেরা সব সময়ই হতাশাগ্রস্থ মানুষদের আশার আলো জাগিয়ে থাকেন। যারা সামান্য ব্যর্থতায় পরাজয়ের কষ্ট আর গ্লানি নিয়ে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েন তাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছেন ক্যালোরি কাকাসের মতো মানুষেরা।

আপনার মতামত লিখুন :