সুচির বিরুদ্ধে সরব বিশ্ব

জিএস নিউজ ডেস্কজিএস নিউজ ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৯:৪২ এএম, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

জিএস নিউজ :>>>

মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা-নির্যাতনের ভয়াবহতার ঘটনায় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও বৌদ্ধ চরমপন্থী এবং দেশটির কার্যত প্রধান অং সান সুচির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘসহ বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট গতকাল মিয়ানমারের নেত্রী সুচিকে ফোনে নিরপরাধ মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে চাপ সৃষ্টি করতে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আসছেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মালদ্বীপ ইতিমধ্যে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। : তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইপ এরদোগান মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচিকে ফোন করে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ নিয়ে উদ্বেগ এবং নিন্দা জানিয়েছেন। গত সপ্তাহে তিনি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ চলছে। আর গতকাল মঙ্গলবার এরদোগান সরাসরি ফোন করেছেন মিয়ানমারের সবচেয মতাবান রাজনৈতিক নেত্রী অং সান সুচিকে। বার্তা সংস্থা এএফপি এবং রযটার্স প্রেসিডেন্টের মুখপাত্রদের উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে, ফোনালাপে এরদোগান সুচির কাছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ নিয়ে উদ্বেগ এবং নিন্দা জানিয়েছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সুচিকে বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, ‘নিরপরাধ মানুষের ওপর সন্ত্রাসীর তৎপরতার নিন্দা করছে তুরস্ক। মিয়ানমারে যে মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে সেটি উদ্বেগ এবং ক্ষোভের বিষয।’ সুচির উত্তর বা প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি। তুরস্কের সরকারি বার্তা সংস্থা আনাদলু জানিয়েছে, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে এবং কথা বলতে প্রেসিডেন্ট এরদোগান তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসোগলুকে বুধবার বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন। ঈদের ছুটির সময় প্রেসিডেন্ট এরদোগান এই সঙ্কট নিয়ে বিভিন্ন মুসলিম দেশের নেতাদের সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এমনকি জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অন্তোনিও গুতেরেজের সাথেও কথা বলেছেন তিনি। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের উপায় খুঁজে বের করতে ঢাকায় এসেছেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট উইডুডুর নির্দেশনায় তিনি মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। মারসুদি মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সুচি এবং সেনাপ্রধান মিন অংয়ের সাথে আলোচনা শেষে ঢাকার নেতৃবৃন্দের সাথে সংকটটি নিয়ে মতবিনিময় করবেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপীয় ও কনস্যুলার) কামরুল আহসান তাকে স্বাগত জানান। বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় মারসুদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সাথে বৈঠক করেন। এরপর সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাাৎ করেন। রাতেই তার ঢাকা ছেড়ে যাবার কথা। মিয়ানমারে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মারসুদি বলেন, রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীকে সব ধরনের সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। একইসাথে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে দুর্গত মানুষের কাছে মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। : গত ২৫ আগস্ট রাখাইনের পুলিশ স্টেশন ও সেনা ছাউনিতে সন্ত্রাসী হামলার প্রোপটে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরু করে। হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের কারণে এ পর্যন্ত লাধিক রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সংকট থেকে উত্তরণে আবুল হাসান মাহমুদ আলী ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদির সাথে টেলিফোনে কথা বলেন।

এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার অভ্যন্তরেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে সে দেশের সরকারকে তৎপর হওয়ার চাপ সৃষ্টি হয়। এরই প্রোপটে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ পাঠিয়েছেন। : এেিদক এক সময় নিজ দেশে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে খ্যাতি কুড়ানো, মিয়ানমারের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী নেত্রী অং সান সুচির বিরুদ্ধে সোমবার চাপ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তার দেশে সেনাবাহিনীর অভিযানের নিন্দা জানানো হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। সেনাবাহিনীর ওই অভিযানের ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশ করছে বাংলাদেশে। এর প্রতিবাদে ফুঁসে উঠছে এ অঞ্চল। সুচির অনুজ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী (মালালা ইউসুফজাই) টুইটারে সুচির মুখোমুখি হয়েছেন। নোবেল কমিটি মিয়ানমারের এমন নৃশংসতায় প্রকাশ্যে সুচির সমালোচনা করবে নাকি তার নোবেল পুরস্কার বাতিল করবে তা নিয়ে অনেকেই দাবি তুলেছেন, বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। নির্যাতিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে নৃশংসতা চালানোয় সোমবার প্রতিবাদ হয়েছে ক্যানবেরায় অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টের বাইরে। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় আগুনে পোড়ানো হয়েছে অং সান সুচির ছবি। সেখানে মিয়ানমারের দূতাবাসে ছোড়া হয়েছে গ্যাসোলিন বোমা। ইন্দোনেশিয়ায় বিােভের আয়োজক ফরিদা। তিনি শুধু এই নামেই পরিচয় দেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যা করা হচ্ছে। আর বাকি বিশ্ব রয়েছে নীরব।

: মিয়ানমারে সর্বশেষ সহিংসতা শুরু হয় গত মাসে (২৫ আগস্ট)। ওই সময় রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিরা মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশি চৌকি বা পোস্টে হামলা চালায়। এ হামলার দায় স্বীকার করে আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি। তারা ওই হামলা সম্পর্কে বলে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা রাকারীরা যাতে আর নিষ্পেষণ চালাতে না পারে সে জন্য ওই হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু সেনাবাহিনী তার জবাব দিচ্ছে কঠোরভাবে। তারা এর নাম দিয়েছে ‘কিয়ারেন্স অপারেশনস’। মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলোর মতে, সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের শত শত বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করছে। তারা (বাংলাদেশে) গাদাগাদি করা শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঠাঁই পাওয়ার চেষ্টা করছে। : তাদের এই দুর্ভোগ ক্রমাগত বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এতে করে নতুন করে সমালোচনা হচ্ছে মিয়ানমারের। সেই সমালোচনা করছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। এর মধ্যে রয়েছে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অনেকে। পাকিস্তানি মুসলিম, সবচেয়ে কম বয়সী নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই সোমবার টুইট করেছেন। তিনি লিখেছেন, কয়েক বছর ধরে বার বার আমি এই ট্রাজিক ও লজ্জাজনক আচরণের নিন্দা জানিয়ে আসছি। এখনও আমি অপোয় আছি আমার অগ্রজ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সুচিও তেমনি নিন্দা জানাবেন। এ জন্য বিশ্ব ও রোহিঙ্গা মুসলিমরা অপো করছেন। গত বছর মালালা ইউসুফজাই, ডেসমন্ড টুটু ও আরো ১১ জন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একটি খোলা চিঠিতে স্বার করেছিলেন। তারা মিয়ানমারের রাখাইনে গণহত্যায় সতর্কতা উচ্চারণ করেছিলেন। অনলাইনে ওই চিঠি ও মালালা ইউসুফজাইয়ের টুইটে দেখেছেন অং সান সুচির সমালোচকরা। তারা মিয়ানমারের এই সঙ্কটের জন্য দায়ী করেন সুচিকে। একই সঙ্গে তারা সুচির শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বাতিল করার জোর দাবি তুলেছেন।

এসব আবেদন অং সান সুচির রাজনৈতিক বন্দিত্বের যে সুখ্যাতি ছিল তার ওপর এক কালো ছায়া ফেলেছে। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ওই নির্বাচনকে বাতিল করে তাকে গৃহবন্দি করা হয়। ১৫ বছর তিনি সামরিক জান্তার অধীনে গৃহবন্দি ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সংবিধানের অধীনে মতা ভাগাভাগির চুক্তি হয়। তার অধীনে গত নির্বাচনে সুচির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। কিন্তু সংবিধানের অধীনে তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না। তাই তাকে বানানো হয় স্টেট কাউন্সেল। তবে মতার নিয়ন্ত্রণ রয়ে যায় কার্যত সেনাবাহিনীর হাতে। : রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছেন। সাংবাদিকরা এ নিয়ে তাকে চাপাচাপি করলে তিনি সেনাবাহিনীর সুরে সুর মিলান। সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক মনে করে না। তারা তাদেরকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখে। ২০১২ সালের সহিংসতার পর ২০১৩ সালে সুচি বিরল এক সাাৎকার দেন। (তখন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযানকে জাতি নির্মূল অভিযান বলে অভিযোগ করা হচ্ছিল। তার জবাব দেন সুচি।) তিনি বলেন, না, এটা জাতি নির্মূল করে দেয়ার অভিযান নয়। : উল্লেখ্য, বিতর্ক সৃষ্টিকারী প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সুচি একাই নন। অতীতে হেনরি কিসিঞ্জার, বারাক ওবামার পুরস্কার বাতিল করতে নোবেল কমিটির কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন এক্টিভিস্টরা। ১৯৯৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান যৌথভাবে ইসরাইলের নেতা শিমন পেরেস, আইজাক রবিন ও ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাত। এর প্রতিবাদে নোবেল কমিটির একজন সদস্য পদত্যাগ করেন। তিনি হলেন কারে ক্রিশ্টিয়ানসেন। তিনি ইয়াসির আরাফাতকে ‘টেরোরিস্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তার মতে, আরাফাত নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য নন। নোবেল কমিটিতে যারা থাকেন তারা সবাই নরওয়ের নাগরিক। তাদেরকে নিয়োগ করে দেশের পার্লামেন্ট। এ কমিটি কখনো কারো পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়নি। কমিটির সাবেক সদস্য গুনার স্টালসেট বলেছেন, অং সান সুচির েেত্রও নেয়া হবে না। তিনি বলেন, শান্তি পুরস্কার কখনো বাতিল করা হয় না। নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর বিরুদ্ধে কমিটি নিন্দা জানায় না। একবার পুরস্কার হাতে তুলে দেয়ার পর নোবেল কমিটির দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। : আল জাজিরার খবরে বলা হয়, ২৪ আগস্ট রাতে শুরু হওয়া নতুন অভিযান নিয়ে জনসমে কোনো প্রকার মন্তব্য করতে দেখা যায়নি সুচিকে। সুচির এ নীরবতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি। সর্বকনিষ্ঠ নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই তার টুইটারে বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে চলা এ নিষ্ঠুর ও ঘৃণ্য কাজের সমালোচনা করে এসেছি। আমি এখনো অপোয় আছি আমার সহযোদ্ধা নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সুচি কিছু একটা করবেন।’ এদিকে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিফাহ আমান অং সান সুচির নীরবতাকে সরাসরি প্রশ্ন করেছেন। বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘স্পষ্ট করে বলতে গেলে অং সান সুচির ওপর আমি অসন্তুষ্ট। পূর্বে তিনি মানবাধিকারের নীতির ওপর দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তিনি কিছুই করছেন না।’ মিয়ানমারে মানবাধিকারের বর্তমান অবস্থা দেখার দায়িত্বে থাকা জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি সোমবার জানান, ‘গত কয়েক বছরের মধ্যে সম্ভবত বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ সময় যাচ্ছে। হাজার হাজার লোক কঠিন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন।’ সংঘাতপূর্ণ রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী ও মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বিজিপির মধ্যে চলা গত ১০ দিনের লড়াইয়ে অন্তত ৯০ হাজার বেসামরিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা এর বর্ণবাদী রাষ্ট্রের মতো বিধিনিষেধের মধ্যে বসবাস করেছে। তাদের নাগরিকত্ব ছিল না এবং চলাফেরায় বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। : গত বছরের অক্টোবর মাসে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের একটি ুদ্র দল মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর একটি ফাঁড়িতে হামলা চালায়। তার জবাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও পুলিশ রোহিঙ্গাদের ওপর অভিযান শুরু করে। জাতিসংঘ আশঙ্কা করছে, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন শুরু করেছে। আর ২৪ আগস্ট কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়িতে আরসার হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বিজিপি কড়া প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু করে। গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হয়। মিয়ানমার সরকারের তরফ থেকেই স্বীকার করা হয়েছে অন্তত ২৬২৫টি বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং চারশোর বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। অবশ্য মিয়ানমারের অভিযোগ, এগুলো করেছে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা। কিন্তু রাখাইন রাজ্য থেকে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্রবাদী বৌদ্ধ জনতা তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে এবং দেখামাত্র গুলি করছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গা পাওয়া গেছে। কয়েকজন আহতের পা কেটে ফেলে দিতে হয়েছে। : মিয়ানমারে নতুন করে শুরু হওয়া জাতিগত নিধনে হাজারো রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসছে। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গত ১০ দিনে অন্তত ৯০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। জাতিসংঘের বরাতে জানা যায়, গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু করে এ সপ্তাহ পর্যন্ত অন্তত দেড় লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজার এলাকার বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী পাহাড়গুলোতে আশ্রয় নিয়েছে আরো ৩০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা, যারা খাবার ও পানির তীব্র সংকটে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে অবস্থানরত জাতিসংঘ কার্যালয়ের সমন্বয়কের দফতর থেকে জানানো হয়, রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্য পাঠানো স্থগিত করতে হয়েছে। কারণ দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকার সরেজমিনে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। এ ছাড়া নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ১৬ হাজার শিশু রয়েছে, যারা স্কুলে যাওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু সংঘাতের ফলে তারা শিার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে ৫ হাজারেরও বেশি, যাদের টিকা কর্মসূচির আওতায় আনা দরকার। শরণার্থী শিবির ও অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেয়া বেশিরভাগ শিশুই ুধার্ত ও ট্রমার মধ্যে আছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেফ এরদোগান রোহিঙ্গাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর ‘গণহত্যা’ চলছে বলেও অভিযোগ তোলেন এরদোগান। তিনি আরো জানান, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভরণপোষণ করতে প্রস্তুত তুরস্ক। সোমবার এক বিবৃতিতে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জকো উইদোদো বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সাম্প্রতিক সহিংস আচরণের জন্য আমি এবং ইন্দোনেশিযার জনগণ দুঃখ প্রকাশ করছি। এই সহিংসতা বন্ধের জন্য ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন এবং নিন্দা জানাতে কেবল বিবৃতি নয়, বরং ইন্দোনেশিয়ান সরকার এই মানবিক সঙ্কট সমাধানে সাহায্য করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ : তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত এবং তাদের সাহায্য করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদাযর মধ্যে সমন্বয থাকা উচিত।’ ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি সোমবার মিয়ানমার নেত্রী অং সান সুচি ও সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মিন অং লাইংয়ের সঙ্গে সাাৎ করেছেন এবং রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে পদপে নেয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন। এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছেদ করেছে মালদ্বীপ। চলমান রোহিঙ্গা সংকটে পাকিস্তান তার ‘তীব্র ােভ’ প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ সোমবার সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর এ ধরনের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি বন্ধে কার্যকর পদপে নেয়ার আহ্বান জানান। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে বিােভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। এদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও চেচনিয়া অন্যতম। : গত ২৪ আগস্ট মধ্যরাতের পর রোহিঙ্গা স্বাধীনতাকামী যোদ্ধারা অন্তত ২৫টি পুলিশ স্টেশন ও একটি সেনাক্যাম্পে প্রবেশের চেষ্টা করলে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এরপর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হেলিকপ্টার গানশিপের ব্যাপক ব্যবহার করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এতে মিয়ানমার সরকারের হিসাবে ৪ শতাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষে আহত শত শত রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে এসেছেন।

আপনার মতামত লিখুন :