ময়মনসিংহকে প্রধান আইসিটি নগরী গড়তে চান উদ্যোক্তা আরাফাত

জিএস নিউজ ডেস্কজিএস নিউজ ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৫:৫৯ পিএম, ১৮ জুন ২০১৭

ওবায়দুল হক, ময়মনসিংহ:>>>

ময়মনসিংহের তরুণ আইটি উদ্যোক্তা আরাফাত রহমান। প্রতিষ্ঠা করেছেন সফটওয়্যার নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘সফটএভার’। এটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ কয়েকটি দেশের প্রতিষ্ঠানের পার্টনার হিসেবেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

 

তরুণ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়ে ময়মনসিংহকে দেশের প্রধান আইসিটি নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চান আইটি ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোক্তা আরাফাত রহমান। সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

 

আরাফাতের শুরুটা হয়েছিল ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল কাইচাঁন গ্রাম থেকে। ২০০৮ সাল, দেশে তখনও থ্রিজি সেবা আসেনি। গ্রামে তখন সবগুলো অপারেটরের নেটওয়ার্কও পৌঁছায়নি। আরাফাত তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। বাবা প্রবাসী হওয়ায় বাবা থেকে প্রথম মাল্টিমিডিয়া মোবাইল পায়। যা দিয়েই তার ইন্টারনেটের সংস্পর্শে আসা।

 

আজঅব্দি তিনি কোনো ট্রেনিং প্রতিষ্ঠানে যাননি। সবই শিখেছেন গুগল, ইউটিউব সার্চ করে, ব্লগ পড়ে এবং ভিডিও টিউটোরিয়ালের মাধ্যমে। ২০১০ সালের শেষের দিকে কম্পিউটারে হাতেখড়ি নিকটবর্তী এক আত্মীয়ের মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকান থেকে। ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে গুগল ব্যবহারে ওয়েবসাইট সম্পর্কে জানতে পেরে চরম আগ্রহী হয়ে উঠেন ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শেখার প্রতি।

 

এছাড়া ২০১৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেই শুরু করেন নিজের ল্যাপটপেই ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টের কাজ শেখা। চার-পাঁচ মাসের মধ্যেই আরাফাত ও তার এক বন্ধু জিহাদুর রহমান নয়ন মিলে ‘গ্রিন আইটি বাংলাদেশ’ নামে গ্রাম থেকেই একটি স্টার্ট-আপ শুরু করেন। কয়েক মাসে বেশ কিছু দেশীয় ক্লায়েন্টও পেয়ে যান। পরে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে সেটির নাম পরিবর্তন করে ‘ময়মনসিংহসোর্স’ নামে যাত্রা শুরু করেন। আস্তে আস্তে তাদের ব্যবসার পরিধি বড় হতে থাকে আর ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশব্যাপী।

 

তবে ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে ‘ময়মনসিংহসোর্স’ এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। প্রতিষ্ঠানটির ক্লায়েন্টগুলো ‘হোস্টআলপাইনে’ দিয়ে দেন। তারপর শুরু করেন অনলাইন মার্কেটিংয়ের কাজ। এতে ৩ মাসের বেশি সময়েও কোনো সুবিধা করতে পারেননি। বরং আর্থিকভাবে বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হন তারা।

 

তবে দমে যাননি পরিশ্রমী আরাফাত। তিনি নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “পুনরায় আমি ও জিহাদুর রহমান নয়ন মিলে ময়মনসিংহসোর্সকে আবার শূন্য থেকে শুরু করি। কিন্তু এক পর্যায়ে জিহাদুর রহমান নয়ন প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে চলে যায়। শুরু হয় একা পথচলা। তবে কঠোর পরিশ্রমের কারণে সফলতাগুলো আসতে থাকে ২০১৬ সালের শুরু থেকেই। জানুয়ারিতে আমি ও আমার সহযোগী রিয়াদ মিলে সফটওয়্যার নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘সফটএভার’ প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করি। সে অনুযায়ী কাজ শুরু করি। যা ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।”

 

তার প্রতিষ্ঠান সফটএভারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটি মূলত একটি সফটওয়্যার নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়েও কাজ করছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ কয়েকটি দেশের প্রতিষ্ঠানের পার্টনার হিসেবেও কাজ করেছি। এছাড়া ১০টিরও বেশি দেশে আইটি সেবা দিচ্ছি আমরা।”

 

উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার শুরুর দিকে বিভিন্ন প্রতিকুলতার কথা জানিয়ে আরাফাত বলেন, “আমাদের শুরুটা একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যেখানে এখনো পাকা রাস্তা নেই। আর আমরা যখন অনলাইনের কাজ শুরু করি তখন আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা ছিল না। তাই কম্পিউটার চালানো কিংবা ইন্টারনেট ব্রাউজের জন্য ২ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে বিরুনিয়া বাজারে আসতে হতো। তখনকার সময় ইন্টারনেটের গতি ছিলো প্রতি সেকেন্ডে ৮-১০ কিলোবাইট। গ্রামে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকায় বিরুনিয়া বাজার থেকে প্রতিদিন ল্যাপটপ চার্জ দিয়ে বাড়িতে বসে অফলাইনে কাজের অনুশীলন করতাম এবং পুনরায় বাজারে গিয়ে ইন্টারনেট ব্রাউজ করতাম। তাই গ্রামে থাকাকালীন আমাদের গ্রাহকদের দ্রুত সেবা দিতে সমস্যা হতো।”

 

আরাফাত বিশ্বাস করেন মফস্বল অঞ্চলকে আইটি সেক্টরে উন্নত করতে পারলেই প্রকৃত ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব। সে লক্ষ্যেই ময়মনসিংহের আইটি প্রফেশনালদের সবচেয়ে বড় অনলাইন কমিউনিটি ‘ময়মনসিংহ আইটি পার্ক’ এর প্রতিষ্ঠানেরও মূল ভূমিকা পালন করছেন তিনি।

 

ময়মনসিংহকে দেশের অন্যতম আইসিটি নগরী হিসেবে গড়ে তুলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে আরাফাত বলেন, “আইসিটিতে উন্নত দেশের কোনো আইসিটি নগরীই রাজধানী কেন্দ্রিক গড়ে উঠেনি। তবে আমাদের দেশের আইসিটি নগরী রাজধানী কেন্দ্রিক গড়ে উঠায় আইসিটি শুধু রাজধানীতেই সিমাবদ্ধ থাকছে। তাই রাজধানীর বাহিরে শিক্ষা-সাহিত্য, স্বাস্থ্য ও শিল্প ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা ঐতিহাসিক ময়মনসিংহকে দেশের অন্যতম আইসিটি নগরী হিসেবে গড়তে স্থানীয় আইটি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কাজ করছি।”

 

সব কাজেই প্রতিবন্ধকতা আসবে, তাই বলে থেমে থাকার পাত্র নন আরাফাত। তিনি জানান, এসব কাজ করতে গেলে অবশ্যই ধৈর্য প্রয়োজন। মেধা, ধৈর্য ও সততার সঙ্গে নিজের কাজটি করতে হবে।  আমি যেহেতু ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করি তাই সৃজনশীলতার বিষয়টিও কাজের মধ্যে থাকতে হয়। এ কারণে নিজের চারপাশ থেকে শেখার ও পর্যবেক্ষণের বিষয়টিও জড়িত। ওয়েব ডেভেলপমেন্টে ক্যারিয়ার গড়তে হলে অবশ্যই পরিশ্রমী হতে হবে।

 

তিনি মনে করেন, একজন উদ্যোক্তা হিসেবে মানুষের সফলতাগুলো তার উদ্যোগ নেয়ার মধ্যে লুকায়িত থাকে। সাহস করে যে কোনো উদ্যোগ নিলে আর তাতে কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্য ধরে লেগে থাকলেই সফলতা অবশ্যম্ভাবী।

 

নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়ে স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল এ তরুণ আইটি উদ্যেক্তার কাছে। জানালেন, স্বপ্ন পূরণের পথেই হাঁটছেন তিনি। যতই এগোচ্ছেন সামনে আরও নতুন পথ ও সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। পরিকল্পনা রয়েছে সফটএভারের কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত করার।

আপনার মতামত লিখুন :